অবশেষে গণতন্ত্রের দরজা খুলে গেল। একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে। বিএনপি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত। সোমবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। তার পরই গঠিত হবে নির্বাচিত সরকার। সবকিছু ঠিক থাকলে, চলতি সপ্তাহেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু নতুন সরকারের যাত্রাপথ কঠিন। অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকারকে। বিএনপি কি পারবে?
এ নির্বাচনে দেশের মানুষ বিএনপির পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। সংগত কারণেই নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেশি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার এ প্রত্যাশার চাপ কতটা সামাল দিতে পারবে?
নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁদের সরকারের অগ্রাধিকারগুলো সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন। আমরা জানি যে, কোনো সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা। বিএনপি কি বাংলাদেশে বিদ্যমান সংকটের উৎস খুঁজে বের করতে পেরেছে?
বাংলাদেশের এখন প্রধান সমস্যা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এক কথায় ভয়াবহ। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম নেতিবাচক দিক হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ জনজীবন। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু ’২৪-এর পাঁচ আগস্টের পর বেশকিছু দিন পুলিশ ছাড়াই চলেছে দেশ। এ সময়ে সশস্ত্র বাহিনী দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সেনাবাহিনী যদি মাঠে না থাকত তাহলে দেশের পরিস্থিতি কি হতো তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনী নতুন করে কাজ শুরু করে। গত ১৮ মাসে পুলিশ বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এখনো পুলিশ বাহিনীর সদস্যের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ করা যায়। গত ১৮ মাসে সেনাবাহিনীই ছিল মানুষের আশা-ভরসার প্রধান জায়গা। এমনকি ১২ ফেব্রুয়ারির শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রধান কৃতিত্ব সেনাবাহিনীর। নতুন সরকার গঠিত হলে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। সেনাপ্রধান একাধিকবার একথা বলেছেন। সেনাবাহিনী ব?্যারাকে ফিরে গেলে কি এ হতোদ?্যম পুলিশ বাহিনী পারবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে?
গত ১৮ মাসে সারা দেশে গড়ে উঠেছে মব বাহিনী। এরা একসঙ্গে মিলেমিশে বাড়িঘর, দোকানপাট, ব?্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানায় হামলা করছে। চাঁদা দাবি করছে। এদের হাতে দেশের জনগণ রীতিমতো জিম্মি। নতুন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে এ মব সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজদের নির্মূল করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা।
এ সময়ে হাজার হাজার মিথ্যা, বানোয়াট ও হয়রানিমূলক হত্যা মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় লাখ লাখ মানুষ আসামি। মামলাবাণিজ্য হচ্ছে প্রকাশ্যে। বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক- কে নয় হত্যা মামলার আসামি? অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিলেও এসব মামলা প্রত্যাহারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মামলাবাণিজ্যে মানুষ অসহায়। যারা সত্যিকারের অপরাধী তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। মামলাবাণিজ্য করলে ন্যায়বিচারের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ বিচারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। তাই নতুন সরকারের অন্যতম কাজ হলো মামলাবাণিজ্যের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা। দেশের শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। কথায় কথায় মারামারি, ক্লাস বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীরা ক্লাস না করে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করছে। এ নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হবে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকিং খাতে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। বেকারত্ব বেড়েছে। বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবচেয়ে উপেক্ষিত ছিল দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বেসরকারি খাত। বেসরকারি উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকই ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন। অনেকেই সীমিত আকারে ব্যবসা করে নতুন সরকারের অপেক্ষায় আছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজির ঘটনায় বেসরকারি খাতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেক শিল্পোদ্যোক্তার বিরুদ্ধে বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে। অনেককে আওয়ামী লীগের দোসর বানিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। বহু স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে তাদের মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ইমেজ নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। নতুন সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই বেসরকারি খাতকে আস্থায় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যবসায়ীদের কোনো দল নেই। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল রেমিট্যান্স-নির্ভর। এভাবে একটা দেশের অর্থনীতি সচল থাকতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, রপ্তানি কমেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে নতুন সরকারকে। গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের আমলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক পরিম লে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। বহু দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ইমেজসংকটে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে এখনই। জনশক্তি রপ্তানির কূটনীতির ওপর জোর দিতে হবে।
জুলাই আন্দোলনে আমাদের নারীসমাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। কিন্তু গত ১৮ মাসে নারীদের অধিকার সংকটাপন্ন। দেশজুড়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নারীরা মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। নতুন সরকারকে নারীবান্ধব সমাজ তৈরি করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বন্ধু বাড়াতে হবে। খেলাধুলাকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে বিএনপি সরকারকে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে চলছে আতঙ্ক আর ভয়। গত ১৮ মাসে বহু গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে। মবের শিকার হয়েছেন বহু সংবাদকর্মী। অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। অনেকেই কারাগারে আছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি পর্যন্ত দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টাকে। কিন্তু গণমাধ্যমের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারকে অবশ্যই মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তরিক হতে হবে। সরকারের শুধু প্রশংসা করা গণমাধ্যমের কাজ নয়। সরকারের যে কোনো সমালোচনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। এটা শেষ পর্যন্ত সরকারকেই সাহায্য করবে। এবারের নির্বাচনেও বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল পায়নি। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার প্রধান স্থান তাই গণমাধ্যম। ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা, সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা গণতন্ত্রকেই কেবল সংহত করবে না বরং সরকারকেও জনপ্রিয় করবে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির মূল স্লোগান ছিল- সবার আগে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উক্তি হলো- ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। এ কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে বিএনপির নেতা-কর্মীদের। মনে রাখতে হবে বিএনপি দলের সরকার নয়, জনগণের সরকার। যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে, যারা দেয়নি, সবার জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে হবে এ সরকারকে। ক্ষমতায় এসেছি তাই সবকিছু আমাদের। আমরা যা খুশি তাই করব, এ ধরনের সর্বনাশা মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দলের ভিতরে অতি উৎসাহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিছু দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজ আছে যারা যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলে ভিড়ে যায়। এরাই ক্ষমতাসীন দলের বদনামের কারণ হয়। এদের কারণেই সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিএনপিকে এদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী কোনো দলের হতে পারে না। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বলে, সবসময় ক্ষমতাসীন দলে কিছু চাটুকার তৈরি হয়। এদের অতিকথন কেবল জনবিরক্তি তৈরি করে না, সরকারকেও বিব্রত করে। লক্ষ রাখতে হবে, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে যেন এসব চাটুকাররা জনবিচ্ছিন্ন না করতে পারে। অতীতের দিকে তাকিয়ে না থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে নতুন সরকারকে। প্রতিহিংসার রাজনীতির কবর রচনা করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। গণতন্ত্র সত্যিই মুক্ত হবে। যে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে বিএনপি।