নির্বাচন পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনায় বহু বাড়িঘর, দোকানপাট, সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগেরহাটে হামলার শিকার এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বাগেরহাট : বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় আহত বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র (ঘোড়া প্রতীক) প্রার্থীর সমর্থক ওসমান সরদার (২৯) মারা গেছেন। গতকাল দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে শুক্রবার রাতে কচুয়া উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের ছিটাবাড়ি গ্রামে বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ওসমান সরদারসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৬ জন আহত হন। ওসমান সরদার বাগেরহাট সদর উপজেলার পারনপাড়া গ্রামের শাহজাহান সরদারের ছেলে। এদিকে গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় দলের আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই সংঘর্ষের খবর পেয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় দলের ছয়জনকে আটক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মাদারীপুর : মাদারীপুরে এক বিএনপি নেতার বসতবাড়িতে হামলা ও অর্ধশতাধিক হাতবোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। শুক্রবার দিনগত রাতে নতুন শহরের লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায় নদীর ওপারে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক দলের সভাপতি শাকিল হত্যা মামলার আসামি মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার হাওলাদার দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১২ ফেব্রুয়ারি এলাকায় আসেন তিনি ও তার সমর্থকরা। অভিযোগ রয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে তারা লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায় বিএনপির সাবেক নেতা লাভলু হাওলাদারের বাড়িতে হামলা চালান এবং তাকে হত্যার উদ্দেশে বাড়ির আশপাশে অর্ধশতাধিক হাতবোমা ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান।
মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে পরাজয়ের পর বিএনপির দুই গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে কুষ্টিয়া কোর্টপাড়া এলাকায় অবস্থিত জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে এ ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কুষ্টিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতার পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
ফেনী : ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট বাজারে জামায়াত নেতার দুটি দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার দুপুরে উপজেলার মুন্সিরহাট বাজারের পোস্ট অফিস রোডে অবস্থিত জামায়াত নেতা আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন ‘আনোয়ার ফ্যাশন সুজ’ ও ‘ভাই ভাই ক্রোকারিজ’ নামের দোকানে এ হামলার ঘটনা ঘটে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এ ঘটনায় কৃষক দলের নেতা মো. সুমন ও যুবদলের দুই নেতা জড়িত ছিলেন। একই সময়ে বাজারের আরও দুটি দোকানে ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার পর জামায়াত কর্মী আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন। জানা গেছে, এ ঘটনার পর কৃষক দল থেকে মো. সুমনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নড়াইল : সদর উপজেলায় আহসান আজিজুল হাকিম (৩২) নামে এক জামায়াত নেতার মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। তিনি নড়াইল-১ আসনের পরাজিত প্রার্থী ওবায়দুল্লা কায়সারের নির্বাচন পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে জানা গেছে। গতকাল ভোরে উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের মির্জাপুর দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আহসান স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিছালী ইউনিয়ন শাখার বাইতুল মাল সম্পাদক।
টঙ্গী : গাজীপুরের টঙ্গীতে ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয় দখল করাকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকার সাতাইশ এলাকার ৫১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় টঙ্গী পশ্চিম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল লশকর (৪৮) গুরুতর আহত হন। তিনি টঙ্গীর সিরাজ লশকরের ছেলে।
ফরিদপুর : ফরিদপুরের সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার ও বাজার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে পৃথক সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
নাটোর : নাটোরের বড়াইগ্রামের ধানাইদহ গ্রামে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১২টি বাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আহতদের মধ্যে একজন বিএনপি ও ৯ জন জামায়াতের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। সংঘর্ষের সময় কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব ও ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সংঘর্ষের পর পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, শুক্রবার বিকালে ধানাইদহ বাজারে জামায়াত কর্মী সাকিব ও সাব্বিরকে মারপিট করে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা। এ বিষয়ে সকালে ধানাইদহ বাজারে আপস মিটিং করার বিষয়ে উভয় পক্ষের নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়। সকাল ১০টার দিকে গ্রাম থেকে উভয় দলের লোকজন বাজারে আসার সময় তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার উপজেলার ধরমণ্ডল ইউনিয়নে তোফাজ্জলের গোষ্ঠী ও ফখরুলের গোষ্ঠীর মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন কারণে ধরমণ্ডল গ্রামের তোফাজ্জলের গোষ্ঠী ও ফখরুলের গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। তবে নির্বাচন ঘিরে এ দুই গোষ্ঠী দুটি প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন। শুক্রবার সকালে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে নির্বাচনের বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উভয়পক্ষ দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়ায়।
ঝালকাঠি : ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া ও রাজাপুর উপজেলায় পৃথক ঘটনায় জামায়াতের কার্যালয়, কয়েকটি বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও হাতুড়িপেটার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় অন্তত দুই নারী আহত হয়েছেন। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। একই ঘটনায় ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কুমিল্লা : নির্বাচনি বিরোধের জেরে কুমিল্লা-২ সংসদীয় আসনের হোমনা উপজেলায় ডহর গোপ গ্রামে ২৫টি বসতঘরে হামলার অভিযোগ উঠেছে। ওই গ্রামের ভোট কেন্দ্রের বাইরে মারধরের জেরে ফলাফল পরবর্তী বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ভাঙচুর ও লুটের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সরেজমিন ঘুরে ভাঙচুরের নানা দৃশ্য দেখা গেছে।
এদিকে ওই গ্রামের বহু পুরুষ হুমকি ও মিথ্যা মামলার ভয়ে অন্যত্র চলে গেছে বলে বাড়িতে অবস্থানরত নারীরা জানিয়েছেন। হামলার শিকার স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক নসু মিয়া, জসিম ও শাহআলম জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তাতুয়াকান্দির লোকজন জাল ভোট দিতে এলে কেন্দ্রের মূল সীমানায় তাদের সঙ্গে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এতে তাদের তিনজনের ওপর হামলা হয়।
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশিদ আলম চৌধুরী বলেন, হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়ে তিনি শুনেছেন, কিন্তু লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। তবে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি জানান।