গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ সংস্কার ও পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। একই সঙ্গে তিনি জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নিতে হবে। গতকাল রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোট-২০২৬ এ জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে গণভোটের ফলাফল বিষয়ক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি একথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘লক্ষণীয় যে ভোটারদের ৬০ শতাংশরও বেশি গণভোটে অংশ নিয়েছেন এবং তা জাতীয় সংসদের নির্বাচনের চেয়েও এক শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের নাগরিকরা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবসমূহের অনুকূলে তাদের রায় দিয়েছেন। এ রায় থেকে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের নাগরিকদের বৃহদাংশ আর পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বা স্থিতাবস্থা বহাল রাখতে চান না। তারা চান পরিবর্তন, রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কার।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, একটি জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক সিদ্ধান্ত বা শাসনের মাধ্যমে টেকসই হবে না। জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি, পরিবর্তনে চূড়ান্ত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে। তাই দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক পথের মূল ভিত্তি। এ লক্ষ্যেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কারের দিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন। জনগণ এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন, তাই সংস্কারের পক্ষে জনরায় এসেছে।’ গণভোটের ফলাফল শুধু সংখ্যার দিক থেকে দেখার বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের এ রায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থানে প্রাণদানকারী ও আহতদের অর্পিত দায়িত্বের স্বীকৃতি। অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা দেখিয়েছে। আপস-সমঝোতার যে ঐতিহ্য রচনা হয়েছে, তা ধরে রেখে জনরায় সমর্থিত এই দলিল বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ন্যস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গণভোটে সংস্কারের পক্ষে যে সুস্পষ্ট গণরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে সব দল অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দল, জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী দল এবং সংসদের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান হচ্ছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ গণরায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংবিধান সংস্কার আদেশ-২০২৫’-এ বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং তারা দুটি শপথ নেবেন। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ও অন্যান্য দলগুলো তাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আলোকে পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘জনরায়ের মধ্য দিয়ে যে দলগুলো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সদস্য পদ লাভ করেছে, তাদের দায়িত্ব রয়েছে এই দুটো দিক বিবেচনায় নেওয়ার। সব দলই তা গুরুত্ব দেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী গণভোটে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার; যা মোট ভোটের প্রায় ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন; যা কাস্ট হওয়া মোট ভোটের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন ভোটার; যা কাস্ট হওয়া ভোটের প্রায় ৩১ শতাংশ। লক্ষণীয় যে ভোটারদের ৬০ শতাংশেরও বেশি গণভোটে অংশ নিয়েছেন, তা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়েও এক শতাংশ বেশি। তিনি আরও বলেন, অনেকে শুধু গণভোটে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রতীকে ভোট দেননি। সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ হওয়ার কথা। তার পর এটি নির্বাচিত সরকার দেখবে। বিএনপি অতীতে বড় বড় সংস্কার করেছে। আমাদের বিশ্বাস, তারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।