ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পর বিজয়ী এমপিদের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন অপেক্ষা শপথ ও নতুন সরকার গঠনের। ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে মন্ত্রিপরিষদের শপথ হবে বলেও জানা গেছে। মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে ১ হাজার অতিথি আমন্ত্রণ পাবেন তবে এমপিদের শপথে এমপি ছাড়া অন্য কেউ এমনকি স্ত্রী-স্বামী প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বঙ্গভবন প্রস্তুতের পুরো বিষয়টি আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল তদারকি করছেন। সংসদ সচিবালয় ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। গতকাল বিকালে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে নিশ্চিত করে বলেন, সংসদ সদস্যদের শপথের দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে ১৭ তারিখ। ওইদিন সকালে সংসদের শপথ কক্ষে নতুন এমপিদের শপথ হবে। সংসদ সচিবালয়ের সব রকমের প্রস্তুতি আছে। শপথ অনুষ্ঠানে কোনো অতিথি থাকবে কি না জানতে চাইলে বলেন, এটা এখনই বলতে পারছি না। সংসদের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ আছে শপথে কেউ থাকে না এমপি ছাড়া। এবারও তাই হবে। এমপিদের স্ত্রী-স্বামীও থাকছেন না শপথের অনুষ্ঠানে। নতুন এমপি ও মন্ত্রিপরিষদের শপথ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ১৭ তারিখের মধ্যে সব শপথ হবে।
গত কয়েক দিন ধরে এমপিদের শপথ কে পড়াবেন এটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি শপথ পড়াবেন এমন আলোচনা হলেও শেষ মুহূর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই নতুন এমপিদের শপথ পড়াবেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে কয়েকজন উপদেষ্টার বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সংবিধান অনুযায়ী সিইসি বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন মর্মে আলোচনা হয়েছে। সে মোতাবেক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। শপথ কে পড়াবেন এ বিষয়ে গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার না থাকলে প্রধান বিচারপতি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন। আর মন্ত্রিসভার সদস্যদের রাষ্ট্রপতিই শপথ পড়াবেন। সংবিধানের ১৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদায়ি স্পিকার নতুন এমপিদের শপথ পাঠ করাবেন। গণ অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, পদত্যাগ করলেও তিনিই স্পিকার হিসেবে শপথ পড়ানোর কথা। বিগত সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে আছেন। তিনি এখনো পদত্যাগ করেননি।
সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের মনোনীত কোনো ব্যক্তির কাছেও এমপিরা শপথ নিতে পারবেন। ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে যদি স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের শপথ না পড়ান, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন। অর্থাৎ পদত্যাগ করলেও এমপিদের শপথ পড়ানো বিদায়ি স্পিকারের দায়িত্ব। এর জন্য সংবিধানে তিন দিন সময় নির্ধারণ করা আছে। কোনো কারণে তিনি ব্যর্থ হলে পরের তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমপিদের শপথ পড়াবেন।
শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে সংসদ সচিবালয়। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নতুন এমপিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত দুই মাস ধরে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা ছুটির দিন শুক্র শনিবারও অফিস করছেন। একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিগত ২০২৪ সালে গণ অভ্যুত্থানের সময় সংসদের ক্ষয়ক্ষতিগুলো মেরামত করে ঠিক করা হয়েছে। শপথের আনুষ্ঠানিকতা, প্রটোকল, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন সংসদ সচিবালয়। এ ছাড়া স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষ, সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষ, অধিবেশন কক্ষ ও শপথ কক্ষ ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজানের চাঁদ দেখা গেলে ওইদিন রাত থেকেই তারাবি ও পরের দিন রোজা শুরু হচ্ছে। এ কারণে ১৭ তারিখ সকালে এমপি হিসেবে শপথের পর ওইদিন সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ হতে যাচ্ছে। নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যারা হচ্ছেন তাদের শপথ রোজার আগেই শেষ করতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভিতরে ভিতরে সে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সে মোতাবেক দুটি স্থানে দুটি শপথের প্রস্তুতি চলছে।
মন্ত্রিপরিষদের জন্য নতুন গাড়ি বাড়ি প্রস্তুত : মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. খায়রুল কবীর মেনন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন সরকার গঠনের আগেই গাড়ির প্রস্তুতি রাখতে হয়। গাড়ি একটা সম্ভাব্য প্রস্তুতি আছে, লাগলে আরও বাড়ানো হবে। প্রস্তুত করা বেশির ভাগ গাড়ি ক্যামরি ও ল্যান্সার ব্র্যান্ডের। গাড়ির সঙ্গে চালকও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া যারা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হচ্ছেন তাদের জন্য বাসভবন প্রস্তুত রাখছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর।