একুশ বাঙালির অহংকার। রক্তের বিনিময়ে কেনা এ ভাষা বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালিকে তুলে ধরেছে স্বমহিমায়। ভাষার মাসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিশেষ আয়োজনে কথা বলেছেন কলি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী এস এম মহির উদ্দিন কলি।
বাংলা ভাষার বিবর্তন নিয়ে তিনি বলেন, তৎসম শব্দের গাম্ভীর্য কাটিয়ে ভাষা সাধারণের বোধগম্য হয়েছে। ভাষার এ বিবর্তন স্বাভাবিক। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাংলা এখন অনেক বেশি ব্যবহারিক ও আধুনিক। তবে প্রযুক্তির প্রভাবে মিশ্রণ বেড়ে কখনো ভাষার শ্রী বাড়ছে, আবার কখনো বিকৃতি ঘটছে। শুদ্ধতা বজায় রেখে বিবর্তন গ্রহণ করাই শ্রেয়। সাহিত্যে কোন ধারার পাঠক বেশি এমন প্রশ্নের উত্তরে এই প্রকাশক বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে উপন্যাস ও ছোটগল্পের পাঠক সবচেয়ে বেশি। তবে ইদানীং মননশীল প্রবন্ধ, ইতিহাস ও সমকালীন রাজনীতি নিয়ে পাঠকদের দারুণ ঝোঁক দেখছি। এ ছাড়া থ্রিলার ও রহস্যগল্পের একটি স্থায়ী পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তবে তরুণরা সায়েন্স ফিকশন, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ও মোটিভেশনাল বই বেশি পছন্দ করছে। পাশাপাশি ফ্যান্টাসি ও অনুবাদ সাহিত্যের প্রতিও তাদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে; তারা সমকালীন জীবনের প্রাসঙ্গিকতা খোঁজে। বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণের বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম মহির উদ্দিন কলি বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির ফলে বিশ্বদরবারে বাংলার মর্যাদা বেড়েছে। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে অনুবাদের ওপর। আমাদের ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্য বিশ্বমানের ইংরেজি বা অন্য ভাষায় অনূদিত হলে আন্তর্জাতিকীকরণ আরও সার্থক হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে এ প্রকাশক বলেন, বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। প্রযুক্তির এই যুগে টিকে থাকতে হলে ডিজিটাল মাধ্যমে এর ব্যবহার সহজ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-তে বাংলার সঠিক প্রয়োগ ও শুদ্ধ চর্চা অব্যাহত থাকলে ভাষাটি বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হবে।
সাহিত্যের মূলধারাকে শক্তিশালী করার উপায় কী- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, পাঠকরা বিচ্যুত নয়, বরং রুচির পরিবর্তন হয়েছে। মূলধারাকে শক্তিশালী করতে মানসম্পন্ন ও গবেষণাধর্মী পা ুলিপি নির্বাচনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বিষয়বস্তুকে আধুনিক ও আকর্ষণীয় করতে হবে। সাহিত্যের নানা ধারায় শুদ্ধ বাংলার চর্চা কতটা হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে এ প্রকাশক বলেন, এটি চিন্তার বিষয়। সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা বা বিকৃত ভাষার প্রয়োগ বাড়ছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেন্দ্রিক সাহিত্যে। তবে কলি প্রকাশনী ভাষার শ্রী রক্ষায় বরাবরই কঠোর সম্পাদনার ওপর জোর দিচ্ছে। অমর একুশের শাণিত চেতনার বইমেলায় সব সময় একুশ অবহেলিত অর্থাৎ একুশের প্রকাশনা যৎসামান্য। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ‘মুক্তিযুদ্ধ বাণিজ্য’-এর অন্যতম কারণ। তারা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে এত বেশি অযাচিত কাজ করিয়েছে যে একুশ, সাতচল্লিশ বা জাতীয় ইতিহাসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজের ভাটা পড়েছে। আমাদের এ অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে।