সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপির সংসদ সদস্যরা। তবে সেই শপথ নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা। শপথ গ্রহণের আগে বিএনপির পক্ষে সালাহউদ্দিন আহমদ মঞ্চে উঠে বলেন, বিএনপি সংবিধান মেনে চলছে এবং আগামী দিনেও চলবে। তিনি হাতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের ফরম দেখিয়ে বলেন, এরকম ফরম- এটা সংবিধানে নেই। আরেকটি ফরম দেখিয়ে বলেন, এই ফরমটি (সংবিধানের) তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। তিনি আরও বলেন, আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
এদিকে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট শরিক এনসিপির সংসদ সদস্যরা শপথ করবেন না বলে বেঁকে বসেছিলেন। যদিও পরে নানান নাটকীয়তা শেষে দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে তারা এ শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শপথের সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকের কথা জানান। এ ছাড়া পৌনে ১২টার দিকে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, আইন অনুযায়ী বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় কোনো শপথই নেবে না ১১ দলীয় জোট।
কী ঘটেছিল শপথ নিয়ে : গতকাল সকাল ১০টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে একটি সাদা ফরমে শপথ ও সই স্বাক্ষরের পর নীল আরেকটি ফরমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে নব নির্বাচিত সব এমপিকে দুটি শপথ বাক্যের ফরম ফাইলও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থিত হওয়ার পর সকাল সাড়ে ১০টায় শপথ মঞ্চে ওঠেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় তিনি বলেন, আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। হাতের ফরম দেখিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে। এরপর নীল একটি ফরম দেখিয়ে বলেন, এরকম কোনো ফরম- এটা সংবিধানে নেই। এই ফরমটি তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। এই রকম তখন একটা ফরম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে সাদা ফরম পূরণ করে শপথ করব। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেন জামায়াতের এমপিরা : এরপর নানান নাটকীয়তার পর গতকাল জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা প্রথমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে এ শপথ গ্রহণ করেন। পরে দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তাদের দুটি শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শপথ নেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত এমপিরাও।
শপথ নেন এনসিপির এমপিরাও : বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় প্রথমে বেঁকে বসলেও শেষ পর্যন্ত শপথ নিয়েছেন এনসিপির সদস্যরা। গতকাল দুপুর ১টা ২২ মিনিটে প্রথমে তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর ১টা ২৫ মিনিটে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এনসিপির এমপিরা শপথ গ্রহণ করেন। তাদের দুটি শপথ বাক্যই পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বাক্য : সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নির্ধারিত শপথ বাক্যে বলা হয়, ‘আমি (সদস্যদের নিজ নাম) সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি তাহা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব এবং পরিষদ সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দেব না।’
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি নুর-সাকি-রুমিনসহ স্বতন্ত্র এমপিরা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপি জোটের সদস্য ও গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং স্বতন্ত্র এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মোহাম্মদ সালমান ওমর, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র এমপি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল, কুমিল্লা-৭ আসনের স্বতন্ত্র এমপি আতিকুল আলম, চাঁদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মো. আবদুল হান্নান এবং টাঙ্গাইল-৩ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মো. লুৎফর রহমান খান আজাদও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। তবে দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনের স্বতন্ত্র সদস্য এ জে এম রেজওয়ানুল হক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন তারা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। তবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এর মধ্যে বিএনপি জোটের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসন থেকে, আরেক শরিক গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গতকাল সকালে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ আগে পড়ানো হয়। পরে জামায়াতের এমপিদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। দেরিতে আসায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শপথবাক্য পাঠ করেন বিএনপির ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা ও স্বতন্ত্র সদস্য এ জে এম রেজওয়ানুল হক। তবে এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ইশরাক হোসেন ও রুমিন ফারহানা শপথ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেও রেজওয়ানুল হক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।