জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। প্রত্যাশা হলো রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে দৃশ্যমান পরিবর্তন, নীতির অগ্রাধিকারে স্পষ্টতা এবং শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহির পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী, ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা প্রকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য গভীর, তখন নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন হয়ে ওঠে একটি নীতিগত রিসেটের সময়।
এ সময় সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু এ সময়ই বলে দেয় সরকার কোন পথে হাঁটবে, কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রদর্শন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল হবে। প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল বাজার তদারকি বা ভ্রাম্যমাণ আদালত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্রেমওয়ার্ক, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা আমদানি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে।
সীমিত সময়ের জন্য শুল্ক-ভ্যাট সমন্বয়, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি মূল্যস্ফীতি কমাতে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সংকোচনমূলক কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি বাজারে তারল্য শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। সুদের হার নীতিতে ভারসাম্য আনতে হবে- একদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুদ হ্রাস কর্মসূচি অর্থনীতিতে গতি আনতে পারে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব এ খাতকে দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই একটি স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পূর্ণ চিত্র প্রকাশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বোর্ড কাঠামো গড়ে তোলা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি শক্ত বার্তা যাবে। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত জিডিপির সংখ্যায় নয়, আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর সেই আস্থাই এখন পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি।
কর ব্যবস্থায় সংস্কারও বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ নেই। বিলাসদ্রব্যে কর বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, কর প্রশাসনের পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং করজালের পরিধি সম্প্রসারণ রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি করদাতার হয়রানি কমাতে পারে। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও ২৪/৭ অপারেশন নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব ও আস্থার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের মাদার সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু যদি ব্যবসায়ী সমাজ মনে করে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল, তাহলে অর্থনীতিতেও আস্থার সংকট তৈরি হয়। নতুন সরকারের উচিত প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই এফবিসিসিআইসহ সব বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা। এটি কেবল সাংগঠনিক বিষয় নয়, এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বার্তা।
স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য আজ সামাজিক স্থিতিশীলতার বড় ঝুঁকি। শহরকেন্দ্রিক বিশেষায়িত সেবা বাড়লেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনো মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। প্রথম ১০০ দিনেই উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সংযোগ বাধ্যতামূলক করা, সরকারি হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা এবং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা কাঠামোর খসড়া প্রকাশ করা গেলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্য খাত কেবল সামাজিক সেবা নয়; এটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি।
একইভাবে, ডিজিটাল রূপান্তরের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি নির্মাতা রাষ্ট্রে পরিণত হতে হবে। জাতীয় সাইবার রেসপন্স কাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার অডিট এবং একটি সমন্বিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এ রূপান্তর নিরাপদ হবে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতির জন্য উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ ও দক্ষতা উন্নয়নকে একীভূত করে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি।
সবশেষে, রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতি ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হয় না। প্রথম ১০০ দিনেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিভাজনের বদলে সমঝোতার বার্তা যাবে। নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এ বিশ্বাস রাষ্ট্র সবার, নীতিও সবার জন্য।
প্রথম ১০০ দিন কোনো জাদুকরী সমাধানের সময় নয়। কিন্তু এটি একটি শক্ত ভিত নির্মাণের সুযোগ। যদি সরকার এ সময়টিকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারের সূচনা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তবে জনগণের আস্থা পুনর্গঠিত হবে। বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও দৃঢ় বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ ১০০ দিনই হতে পারে একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের নতুন যাত্রাপথের সূচনা।
এ সময়ের মধ্যেই অর্থনীতির মৌলিক বিষয় ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। তাছাড়া ও প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম এ নির্বাচনি মেনুফেস্টোর প্রতিফলন জনগণের জন্য আশার সঞ্চার করবে।
লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাজুস; পরিচালক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ও এমডি, জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড।