দীর্ঘ একটি বছর পর আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে বরকতময় সিয়াম সাধনা। জীবনের গুনাহগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করে নেকি লাভ ও মুত্তাকি মানুষ বানানোই সিয়াম ব্রতের মূল লক্ষ্য। এমনি এক সিয়ামের পয়লা তারিখে ইরানের গিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন পীরানে পীর দস্তগীর হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)। সময়টা ছিল ৪৭০ হিজরি সন। বেলায়াতের দরজার যত অলি এসেছেন এবং আসবেন সবার সরদার তিনি। একই সঙ্গে শরিয়তেরও বড় আলেম ছিলেন আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘সিররুল আসরার’ আধ্যাত্মিক জগতের এক বিস্ময়কর সম্পদ। সিররুল আসরার শব্দের সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় গোপন রহস্যভাণ্ডার। সির শব্দটি একবচন। অর্থ গোপন রহস্য। আসরার শব্দটি সির শব্দের বহুবচন। অর্থ অনেক গোপন রহস্য। তবে সুফিদের পরিভাষায় সির শব্দের ভিন্ন অর্থ রয়েছে। সির অর্থ হলো- হৃদয়ের এমন গোপন স্তর যেখানে আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ক তৈরি হয় বা বান্দা আল্লাহর গোপন মারেফাত সম্পর্কে জানতে পারে। আসরার মানে হলো- হৃদয়ের আরও গোপন রহস্যময় স্থান বা স্তর, যেখানে বান্দা সাধনার মাধ্যমে পৌঁছলে সৃষ্টির সব রহস্য জানতে পারে এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য ও নূরের স্বাদ অনুভব করে। তরিকতের মাশায়েখদের কাছে স্থানের আরেক নাম হলো- ‘লতিফায়ে খফি’ বা গোপন লতিফা। তবে কেউ কেউ বলেছেন, লতিফায়ে খফির চেয়েও আরও গোপন স্তর হলো আসরার।
সিররুল আসরার কিতাবে বড়পীর রোজার আলোচনা করতে গিয়ে রোজাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্যান্য ইবাদতের মতো রোজাও দুই প্রকার। শরিয়তের রোজা। তরিকতের রোজা। শরিয়তের রোজা হলো ইমানের সঙ্গে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকা। আর তরিকতের রোজা হলো আল্লাহ যেসব কাজ নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা। রমজানের এক মাস শরিয়তের রোজা রাখা ফরজ। আর তরিকতের রোজার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। বরং জীবনব্যাপীই একজন মুমিনকে এই রোজা পালন করে যেতে হবে। সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি, অন্যায়, অনাচার, গিবত, হিংসা, অহংকারসহ যাবতীয় পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টার নামই তরিকতের সিয়াম সাধনা। মানুষ যখন কোনো গুনা করে সঙ্গে সঙ্গে তার তরিকতের রোজা ভেঙে যায়। আবার তওবার সাহরি খেয়ে এই রোজা শুরু হয়। আর এ রোজার চূড়ান্ত ইফতার হয় প্রভুর দিদারের মাধ্যমে। প্রিয় পাঠক! শরিয়তের সিয়াম আর তরিকতের সিয়ামের যে পার্থক্য বড়পীর করেছেন তা নিছক মনগড়া সিদ্ধান্ত নয়। বরং এর সপক্ষে তিনি বেশ কিছু হাদিস উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রথম হাদিস হলো- নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘এমন অনেক রোজাদার আছে যাদের ভাগ্যে ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া কিছুই জোটে না’ (ইবনে মাজাহ-১৬৯০)। অর্থাৎ কষ্ট করে না খেয়ে থাকায় তাদের কোনো লাভ হয় না। তাদের রোজা আল্লাহর কাছে রোজা হিসেবে কবুল হয় না। রোজাদারের জন্য বিশেষ যেসব নেয়ামত আছে সেসব নেয়ামত ও পুরস্কার থেকে তারা বঞ্চিত হবে রোজা রাখার পরও।
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন অনেক রোজাদার আছে যারা আসলে রোজা রাখেনি। আবার তোমাদের মধ্যে এমন অনেক বেরোজাদার আছে, যারা আসলে রোজার মধ্যেই রয়েছে।’ (সিররুল আসরার ও এহইয়াউল উলুমুদ্দিন)। এ হাদিস উল্লেখ করার পর হাদিসটির ব্যাখ্যায় বড়পীর বলেন, যারা রোজার হক আদায় করে রোজা রাখে, গিবত করে না, পরের হক নষ্ট করে না, সুদ-ঘুষ খাওয়া, বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি গুনা থেকে বেঁচে থাকে তাদের সম্পর্কে নবীজি বলেছেন, তোমরা দেখছো সে রোজা রাখেনি, খানাপিনা করছে, কিন্তু আসলে সে রোজার মধ্যেই আছে। আবার বহু রোজাদার আছে যারা রোজার হক আদায় করে না। রোজা রেখে অশ্লীলতা করে, মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে, কাজে ফাঁকি দেয়, দ্রব্যমূল্য মজুত করে মানুষকে কষ্ট দেয়, ওজনে কম দেয়, এমন ব্যক্তিকে বাহ্যিকভাবে রোজাদার দেখা গেলেও তারা আসলে রোজা রাখেনি। বড়পীর আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলেন, এসব মানুষ ‘নিশ্চিতভাবেই’ রোজার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। রোজার পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘রোজা আমার জন্য। আমিই রোজার পুরস্কার দেব।’
প্রিয় পাঠক! রোজা এসেছে আমাদের মুত্তাকি বানাতে। কিন্তু জীবনে এত রোজা আসলো গেল কিন্তু আমরা মুত্তাকি আর হতে পারলাম না। রোজা রেখে আমরা মিথ্যা বলি। কবিরা গোনাহ করি। কিন্তু আমাদের ভিতর কেঁপে ওঠে না। আমাদের সম্পর্কেই নবীজি বলেছেন, অনেক রোজাদার আসলে রোজাই রাখেনি। আসুন! এ মুহূর্ত থেকে আমরা শরিয়তের রোজার পাশাপাশি তরিকতের রোজার চর্চা শুরু করি। নয়তো রোজা রাখব কিন্তু জান্নাত এবং প্রভুর দিদার নসিব হবে না। বরং রোজার নামে আল্লাহর সঙ্গে, ধর্মের সঙ্গে প্রতারণার কারণে আমাদের উলটো আজাবও ভোগ করতে হতে পারে। আল্লাহ আমাদের বোঝার ও আমল করার তৌফিক দিন। আমিন।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর
www.selimazadi.com