২ মার্চ দিবাগত রাতে (৩ মার্চ) কাতারের স্থানীয় সময় রাত ১টা ৩০ থেকে ১টা ৩৫ মিনিটের ভিতর কাতার আল উদেইদ আমেরিকান এয়ার বেস লক্ষ্য করে ইরান থেকে কয়েকটি মিসাইল উড়ে আসে। আমি রুমের বাইরেই ছিলাম। মিসাইলগুলো ঠিক মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যায়। মিসাইল দেখে ভয়ে রুমের ভিতরে চলে যাই। তবে ওই মিসাইলগুলো আকাশেই ধ্বংস করেছে কাতার। বিকট শব্দ হয়েছে। আমরা খুব ভয়ে আছি। দেশে থাকা পরিবারও খুব চিন্তা করছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে টেলিফোনে এ কথাগুলোই বলছিলেন কাতারের আবু নাখলা এলাকার একটি লেবার ক্যাম্পে বসবাস করা বাংলাদেশি প্রবাসী সুজন আহমেদ।
শুধু সুজন একা নন, একই রকম আতঙ্ক-উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন ও ওমান প্রবাসীরা। এসব দেশে বসবাস করা অন্তত আট থেকে নয় জন প্রবাসীর সঙ্গে গতকাল মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের। এদের অধিকাংশই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন। দিনভর উদ্বেগ ও কাজ করতে না পারার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। একই সঙ্গে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। তারা জানান, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর দেখে দেশে পরিবারের সদস্যরাও আতঙ্কগ্রস্ত। ইরানে গত শনিবার যৌথ হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও, অর্থাৎ প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। কাতার প্রবাসী সুজন জানান, এখন কাতারের পরিস্থিতি থমথমে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরেও যায় না। সরকারি অফিস আদালত সব রিমোপ পদ্ধতিতে চলে (বাড়ি থেকে কাজ)। আমরা যারা শ্রমিক আছি, আমরা সীমিত আকারে কাজ করতে পারছি। কাজে নেওয়া হলেও কিছুক্ষণ পরে ফেরত আসতে হচ্ছে। অধিকাংশ কোম্পানিই কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাতে সাহরির আগে আগে হঠাৎ করেই বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙে। কখনো কখনো মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল উড়ে যাওয়ার শব্দে খুব ভয় পাই। জানিনা কী আছে ভাগ্যে। বাহরাইন প্রবাসী কুমিল্লার বরুড়ার মোহাম্মদ আসিফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাহরাইনে বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম থেকে জেগে যাই। আজকেও (গতকাল) বাহরাইন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে চারটি মিসাইল হামলা হয়েছে। আমরা এখানে যারা আছি, সবাই খুব ভয়ে আছি। তিনি বলেন, হামলার জন্য দুই দিন কাজ বন্ধ ছিল কিন্তু আজকে (গতকাল) কাজে এসেছি। আমাদের কোম্পানি থেকে জানিয়েছে, যদি বেশি সমস্যা দেখা দেয়, তখন আবার কাজ বন্ধ করে দেবে। আসিফ জানান, বাহরাইন সরকার হামলার তথ্য প্রচারের বিষয়ে খুব কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কেউ তথ্য ফেসবুকে শেয়ার করলেও ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার থেকে হামলার বিষয়ে অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়। তবে অধিকাংশ সময়ই বিস্ফোরণের পরে অ্যালার্ট সংকেত পাই। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাহরাইনে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে জানিয়ে এই প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, বাহরাইনের সব কিছুই সৌদি ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। গত কয়েকদিন পণ্য আসছে না। এরই মধ্যে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুপারশপগুলোতে পণ্য সংকট দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের দেরা এলাকায় থাকে চাঁদপুরের আবু হানিফ সুমন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২ মার্চ দিবাগত রাতে দুবাইয়ের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে অনেক ড্রোন হামলা হয়েছিল। তবে অধিকাংশই আকাশে ধ্বংস করেছে আরব আমিরাত সরকার। বিকট শব্দে আমরা ঘুম থেকে জেগে যাই। ঘটনা ঘটেছে সাহরির আগে। তিনি বলেন, সবাইকে অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়েছে ঘরে বসে কাজ করতে। কেউ কাজে যায় না। দুই দিন আগে মেরিনা, ডাউন টাউন, আল মাদা, আল বাদশাহ এলাকায় অনেক বিস্ফোরণ হয়েছে। তিনি বলেন, এখানকার খবর দেখে দেশ থাকা পরিবার খুবই আতঙ্কে আছে। সারা দিনই ফোন দিয়ে খবর জানতে চায়। সৌদি আরব প্রবাসী পারভেজ মুরাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি আছির প্রদেশের আল বাহা এলাকায় থাকি। এখানকার অবস্থা তুলনামূলক ভালো। তবে রিয়াদ ও দাম্মামের অবস্থা খুব খারাপ। সবাই খুব আতঙ্কে আছে। সৌদি আরবের রিয়াদে বসবাসকারী কেরানীগঞ্জের মোহাম্মদ রাসেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রিয়াদজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গতকালও (মঙ্গলবার) মিসাইল হামলা হয়েছে। এখানকার সবাই খুব আতঙ্কে। কাজ চলছে। তবে সবাই ভয়ে ভয়ে কাজে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওমানে থাকা এক প্রবাসী বাংলাদেশি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ওমান সরকার খুব কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কোনো তথ্য কেউ প্রচার করেছে জানতে পারলে ভিসা ব্লক করে দেশে পাঠিয়ে দেবে। তিনি বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর তুলনায় ওমানের অবস্থা কিছুটা ভালো। শহর এলাকায় কোনো বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়নি। মরুভূমিতে কয়েকটি বিস্ফোরণ হয়েছে বলে শুনেছেন তিনি।