জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’র সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার চিঠি কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। একই সঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও গণভোটের তফসিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় কেন তা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে সে প্রশ্নও রাখা হয়েছে। পৃথক দুই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট গতকাল এই রুল দেন।
আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের চিঠি এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে করা দুটি রিট আবেদনের ওপর গত সোমবার শুনানি নিয়েছিলেন হাই কোর্ট।
রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব, আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় তারা। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্যের একটি রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই জাতীয় সনদ। সংস্কার সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান প্রণয়নে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেদিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর আলোকে সংবিধানের কিছু মৌলিক সংস্কারের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হয়। সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ৮(১) ধারায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর একই অনুষ্ঠানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’র সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ধারার আলোকেই গত ১৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’র সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এই শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত দলটির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এই শপথ নেননি। আবার জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচিতরা দুই শপথই নিয়েছেন। ফলে এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। এক পক্ষের দাবি, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে জনরায়কে উপেক্ষা করে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। আর বিএনপির তরফ থেকে বলা হয়, সাংবিধানিক পদ্ধতি মেনেই বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। এমন বিতর্কের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ইসির দেওয়া চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাই কোর্টে রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম। তার আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আরেকটি রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা। এই রিটে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা এবং গণভোটের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।