ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে নেমেছে খোদ ডিএনসিসি। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আশীর্বাদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এজাজ মেয়াদ শেষের মুহূর্তে দিয়েছেন ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডারের ওয়ার্ক অর্ডার। তাই দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কী কী সুবিধা নেওয়া হয়েছে সেগুলো খতিয়ে দেখতে শুরু হচ্ছে তদন্ত।
এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ যদি কোনো দুর্নীতি করে থাকেন সে বিষয়ে আইনকানুন আছে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি শুনেছি ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ডিএনসিসিতে কিছু ফাইল আমার কাছে এসেছে। যেখানে অনৈতিক কাজ হয়েছে। সেগুলো আলাদা করেছি, খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যেই ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা টেন্ডার করে ফান্ড ছাড়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে বাইরের কিছু প্রজেক্টও আছে। শুধু টেন্ডারই করেননি, ওয়ার্ক অর্ডারও দিয়ে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে গেলে একজন প্রশাসক হিসেবে সেটা বাতিল করার এখতিয়ার আমার নেই। কারণ ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে টেন্ডার পেয়েছে, তাকে প্রশাসক দিয়েছে। অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া টেন্ডারগুলো আমি বাতিল করতে পারি। তাই সব টেন্ডার নিয়ে কাজ শুরু করেছি। এটা নিয়ে তদন্ত কমিটি করে যেখানে অনিয়ম হয়েছে সেগুলো খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেব। এসব অনিয়মের সঙ্গে যদি অফিসের কোনো কর্মকর্তাও জড়িত থাকেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আশীর্বাদে ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মোহাম্মদ এজাজ। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানকে পত্র সংখ্যা : ৪৬,০০,০০০০,০০১,৯৯,০০২.২৫-১৫১ উল্লেখ করে চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘প্রিয় সিনিয়র সচিব, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আমি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত আছি। আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, স্থানীয় সরকার বিভাগের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কার্যাদি সম্পন্ন করণের জন্য প্রশাসক হিসেবে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পদায়ন করা প্রয়োজন।
মোহাম্মদ এজাজ, চেয়ারম্যান, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তিনি কর্মজীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হলে এই প্রতিষ্ঠানের কাজের গতি বৃদ্ধিসহ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে বলে আমি মনে করি। এমতাবস্থায়, মোহাম্মদ এজাজ, চেয়ারম্যান, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি।’ এরপর গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসকের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ এজাজ। দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস পার হতেই গাবতলী হাটের ইজারা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ তদন্তে ডিএনসিসিতে অভিযান চালায় দুদক। পরবর্তীতে দরপত্র আহ্বানে প্রক্রিয়াগত ভুল দেখিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা না দিয়ে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত দেন তৎকালীন ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। এক মাসের বেশি সময় খাস আদায় করানোর পর হাট ইজারা দিতে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি। এ দফায় প্রথমবারের চেয়ে বেশি দর পাওয়া যায়। কিন্তু সর্বোচ্চ দরদাতা প্রস্তাবিত অর্থ পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় হাটের ইজারা দেওয়া হয়। এতে গাবতলী হাট ইজারায় ডিএনসিসির আর্থিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি। প্রশাসকের পছন্দের ব্যক্তি সর্বোচ্চ দরদাতা হতে না পারায় দরপত্র আহ্বানে প্রক্রিয়াগত ভুল দেখিয়ে ইজারার পরিবর্তে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে একের পর এক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের তদন্তে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গাবতলী পশুর হাটের ইজারা দেওয়া সংক্রান্ত নথিপত্র। পাশাপাশি ইজারা দেওয়ায় নিয়মের ব্যত্যয় নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন। ডিএনসিসি ই-রিকশা প্রকল্পের রেকর্ডপত্র, বনানীর বোরাক টাওয়ার সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের রেকর্ডপত্র, বনানী কাঁচাবাজারের দোকান বরাদ্দ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, খিলগাঁওয়ের তালতলা সুপার মার্কেটে পার্কিংয়ের স্থানসহ অন্যান্য স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ সংক্রান্ত তথ্য। এ ছাড়া মোহাম্মদ এজাজ প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর উত্তর সিটিতে যেসব সভা ও বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব সভার কার্যবিবরণীসহ সিদ্ধান্ত এবং সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতির তথ্যাদি। এর সঙ্গে ভ্যান সার্ভিস (গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহের) প্রকল্পের দরপত্র ও যাবতীয় তথ্যাদিও চাওয়া হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান থাকায় চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।