অন্তর্র্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের ব্যাংক হিসাব তলবের হিড়িক পড়েছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পর অন্তর্র্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) খোদা বখস চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়ে তাদের অ্যাকাউন্টের তথ্য চায় বিএফআইইউ। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো থেকে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে এই চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
চিঠিতে পরবর্তী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের সব তথ্য এক্সেল শিটে করে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউতে পাঠাতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, অন্তর্র্বর্তী সরকারে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পানিসম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ফাওজুল কবির খান ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা। আদিলুর রহমান খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলবের পর ৪ মার্চ সাবেক এই ছাত্র উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলন করে, তাঁর ব্যাংকের যাবতীয় তথ্য তুলে ধরেন। সাধারণত ব্যাংকে একজন মানুষ তাঁর বৈধ উপার্জিত টাকাই রাখেন। অবৈধ টাকা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যাংকে মানুষ কেন রাখবে? তা ছাড়া টাকা রাখার এখন অনেক জায়গা রয়েছে। বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রাখার অন্তত পাঁচটি নিরাপদ জায়গা রয়েছে। এই গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বে দ্রুত বিট কয়েনের মতো বিভিন্ন সাইবার কারেন্সি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দুর্নীতির কারণে। এই গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বে কালোটাকা সাদা করার জন্য বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এরকম শতাধিক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি রয়েছে, বিনিয়োগের নামে যারা কালোটাকা সাদা করে। কিছু কর স্বর্গ দেশ আছে যেসব দেশে টাকা পাঠালে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। এসব দ্বীপ রাষ্ট্রে টাকা নিয়ে যাবার জন্যও এখন দেশে দেশে এজেন্ট তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি নিয়ে গবেষণা করেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাজার কোটি টাকা এখন নিমেষেই বৈধ হয়ে যায়। কালোটাকা কিংবা অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়ছে, এজন্যই প্রচলিত ব্যাংকিংব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ নিশ্চয়ই এসব তথ্য সম্পর্কে অবগত। তারপরও কেন এই সংস্থাটি ব্যাংক হিসাব তলব করে বা ব্যাংক হিসাব জব্দ করে? বাংলাদেশে এখন পুরো ব্যাংকিংব্যবস্থা ডিজিটাল। একটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে তার সব লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরাসরি চলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএফআইইউ কোথাও কোনো সন্দেহজনক লেনদেন দেখলেই ব্যবস্থা নিতে পারে। তাহলে কেন ব্যাংক হিসাব তলবের এই নাটক?
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নির্দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব তলব এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের মহামারি শুরু হয়। তৎকালীন গভর্নর আসলে তাঁর অপছন্দের ব্যক্তিদের মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ইমেজ নষ্ট করার জন্য এরকম নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে ফল হয় বিপরীত। অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১০ হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব তলব এবং জব্দ করা হয়। এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত বন্ধ আছে প্রায় ১ হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে তাদের শতকরা ৯০ শতাংশের অ্যাকাউন্টে ১০ লাখের নিচে টাকা রাখা আছে। বিএফআইইউ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এসব অ্যাকাউন্টের তথ্য প্রকাশে অসততা এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। যেমন ধরা যাক একজন ব্যক্তির বয়স ৬০ বছর। তিনি সারা জীবনে বিভিন্ন ব্যাংকে ১ কোটি টাকা জমা রেখেছেন। সেখান থেকে সারা জীবনে ৯০ লাখ টাকা তুলেছেন। বিএফআইইউ পুরো জমা ও উত্তোলনকে যোগ করে গণমাধ্যমে বলেছে, তার অ্যাকাউন্টে ২০ কোটি টাকা ছিল, সেখান থেকে ১৯ কোটি টাকা তোলা হয়েছে। লেনদেনের হিসাবকে চক্রবৃদ্ধির হিসেবে উল্লেখ করে তার চরিত্র হননই ছিল আহসান এইচ মনসুরের কৌশল। কিন্তু এই কৌশলের ফলাফল হয়েছে হিতে বিপরীত। একদিকে যখন বলা হচ্ছে, ২৬ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, অপরদিকে কথিত পাচারকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পাওয়া যাচ্ছে মাত্র কয়েক লাখ টাকা তখন অর্থ পাচার নিয়ে কথাবার্তা পানসে হয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগ হচ্ছে দুর্বল। গত ১৮ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে তাদের একজনের বিরুদ্ধেও অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে দেড় বছরে এটা প্রমাণ হয়েছে যে এসব অ্যাকাউন্ট জব্দের কারণ, হয়রানি, প্রতিহিংসা। যে কারণে প্রকৃত অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দেড় বছরও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্র্বর্তী সরকার বিদেশ থেকে পাচারের এক টাকাও উদ্ধার করতে পারেনি। অর্থ পাচারের ইস্যুটাই এখন থিতিয়ে পড়েছে। অনেকই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, অর্থ পাচার নিয়ে সরকার যা বলেছে তার পুরোটা সত্য নয়। এর ফলে প্রকৃত পাচারকারীরা এক ধরনের দায়মুক্তি পেয়েছে। তবে এভাবে ঢালাও ব্যাংক হিসাব তলব এবং জব্দ সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, বিভিন্ন দুর্বল ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা তুলতে না পারা। সব মিলিয়ে একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ব্যাংকিং খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে গেছে। বিত্তবানরা তাদের অর্থ বিত্ত বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও এখন দেশে কিছু করার চেয়ে বিদেশে গিয়ে কিছু করাটা নিরাপদ মনে করছেন। বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং হিসাব তলবের মিডিয়া ট্রায়াল, ব্যাংকিং খাতের অপরিমেয় ক্ষতি করেছে।
এসব নিয়ে যখন বিশ্লেষকদের নানামুখী আলোচনা চলছে ঠিক তখন অন্তর্র্বর্তী সরকারের কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার ব্যাংক হিসাব তলব করা হলো। এটা কি তাদের দুর্নীতি খুঁজতে নাকি তাদের বাঁচাতে করা হলো সেটি ভেবে দেখার মতো বিষয়। কারণ আওয়ামী লীগের পতনের পর যেভাবে ঢালাও ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে, তাতে উপদেষ্টা তো দূরের কথা, ছিঁচকে দুর্নীতিবাজরাও ব্যাংকে ঘুষের টাকা রাখবে না। এদের দুর্নীতি খুঁজতে হবে অন্যভাবে। যেমন তদবির বাণিজ্যে শত কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার (এলজিআরডি) উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করেছিল গত বছরের মার্চে। কিন্তু সরকারের হস্তক্ষেপে সেই তদন্ত থেমে যায়। ওই এপিএস দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর তদন্ত হলেই আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসত। কিন্তু সেটা করা হয়নি কেন? নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন তাঁর ছেলে এম সাফাক হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ সব মিটিং করেছেন। সাফাককে বন্দরের টাকায় ৩২ হাজার টাকা মূল্যের স্যুটের কাপড় উপহার দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান নিজে এই উপহার তুলে দেন। উপদেষ্টার ছেলের বন্দরে কী কাজ তা খতিয়ে দেখলেই সাবেক এই উপদেষ্টার দুর্নীতির উৎস সম্পর্কে জানা সম্ভব। কিন্তু তা করা হয়নি। কেন? আসিফ নজরুল উপদেষ্টা হওয়ার পর ঢালাওভাবে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করলেন কেন? এ নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত করলেই বোঝা যাবে, কে কতটা সাধু। এভাবে সব উপদেষ্টার দেড় বছরের কাজকর্ম তদন্ত করলেই বোঝা সম্ভব কে কী করেছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সবাই শিক্ষিত, সুশীল। তাঁরা এত বোকা নন যে ঘুষের টাকা ব্যাংকে জমা রাখবেন।
উপদেষ্টারা তো বিদায়বেলায় তাঁদের সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। এই হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে এই হিসাব তলবের নাটক কেন? অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর, গণমাধ্যমে এবং সমাজমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠে আসছে। এসব অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়ার জন্যই কি এই আয়োজন?