রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ, একটি ইফতারের সময়, আরেকটি তার প্রতিপালকের সাক্ষাতের সময়।’ (সহিহ বুখারি)। এই সংক্ষিপ্ত বাণীর ভিতর লুকিয়ে আছে রোজার গভীর দর্শন। প্রথম আনন্দটি দৃশ্যমান, সারা দিনের ক্ষুধা ও পিপাসার পর ইফতারের মুহূর্তে যে প্রশান্তি নেমে আসে, তা কেবল দেহের তৃপ্তি নয়; এটি আত্মসংযমে সফল হওয়ার স্বস্তি। এক দিনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার নীরব গৌরব।
দ্বিতীয় আনন্দটি অদৃশ্য, অথচ অনন্ত। সেটি আখিরাতের প্রাপ্তি। যখন বান্দা তার রবের সামনে দাঁড়াবে, আর তার আমলনামায় রোজার সওয়াব দীপ্ত হয়ে উঠবে, তখন সে বুঝবে ক্ষণিকের ক্ষুধা আসলে ছিল চিরস্থায়ী আনন্দের বীজ। ইফতারের হাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংযমের পরেই আসে স্বস্তি। আর রবের সাক্ষাতের আনন্দ স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীর কোনো ত্যাগই বৃথা যায় না। রোজাদারের দুই আনন্দ দুই জগতের সেতুবন্ধন। একটি দেহের, অন্যটি আত্মার; একটি পৃথিবীর, অন্যটি পরকালের। যে রোজা এই উপলব্ধি জাগাতে পারে, সেটিই সফল রোজা। আর যে আনন্দ মানুষকে আল্লাহর দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়, সেটিই প্রকৃত আনন্দ। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.) লেখেন, ইফতারের সময় রোজাদারের আনন্দের মূল রহস্য হলো ইফতারের মুহূর্ত দোয়া কবুলের এক অনুপম সময়। দিনভর সংযমের পর সূর্যাস্ত নিকটবর্তী হয়, আকাশের রং বদলায়, ঠিক তখনই রোজাদারের হৃদয়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ইফতারের সেই মুহূর্ত কেবল আহারের সময় নয়; এটি দোয়ার দরজা খুলে যাওয়ার সময়। ক্ষুধা পিপাসায় অবনত আত্মা তখন সবচেয়ে বিনম্র, সবচেয়ে নিবেদিত, অফুরন্ত আনন্দিত হয় দোয়া কবুলের আশায়। রসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না: রোজাদারের দোয়া যতক্ষণ না সে ইফতার করে, ন্য্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া, অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া।’ (তিরমিজি)। ইফতারের মুহূর্তে রোজাদারের দোয়া বিশেষভাবে কবুলের উপযোগী। কারণ সে তার নফসের চাহিদাকে সংযত করেছে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তার দোয়া তখন কৃত্রিম নয়; অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসে। তাই হাদিসে ইফতারের সময় পড়ার দোয়া শেখানো হয়েছে। মূলত ইফতার কেবল খাদ্যের স্বাদ নয়, বরং প্রার্থনার স্বাদ। এ সময় আমরা যদি দুনিয়ার ক্ষণিক চাওয়া পাওয়ার বাইরে গিয়ে হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, ক্ষমা ও হেদায়াত কামনা করি, তবে সেই দোয়া আমাদের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। প্রতিদিনের ইফতার আমাদের শেখায়- সংযমের পর আসে প্রাপ্তি, আর বিনয়ের পর আসে কবুলিয়ত। তাই ইফতারের সেই ক্ষণিক সময়টুকু হোক চোখের অশ্রু, অন্তরের মিনতি ও বিশ্বাসভরা দোয়ার উজ্জ্বল মুহূর্ত। হয়তো সেই এক দোয়াই বদলে দিতে পারে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।