পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সব সময় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। গতকাল ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই ইফতারের আয়োজন করা হয়। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই আনুষ্ঠানিক ইফতার মাহফিল। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা অংশ নেন। ইফতারের আগে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘আজকের এই ইফতার শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় নানা জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও ঐক্যের গুরুত্বের কথা। এই মূল্যবোধই একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি।’ স্বাধীনতা রক্ষা, মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুদৃঢ় রাখা, নারীদের আরও বেশি ক্ষমতায়ন ও উৎসাহ প্রদান এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের প্রতি সমর্থন দিতে ঢাকায় নিযুক্ত কূটনৈতিকদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাস্তববাদী ও টেকসই, যা পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতিতে পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশীদারিকে মূল্য দিই এবং সামনের বছরগুলোতে খোলামেলা সংলাপ ও শক্তিশালী সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত থাকব।’ তিনি জানান, সরকার আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সমাজের সব স্তরে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একসঙ্গে শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। শুভেচ্ছা বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমমর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।
ইফতারে প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে তাঁর ডান পাশে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। বাঁ পাশে ছিলেন কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে বসে ইফতার করেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা, নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি, ভুটানের রাষ্ট্রদূত দাশো কারমা হামু দর্জি, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রদূত ধর্মপাল বীরাককোডি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, ফিলিস্তিন, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা ইফতারে অংশ নেন।
বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রফেসর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু, খলিলুর রহমান, মিজানুর রহমান মিনু, জহির উদ্দিন স্বপন, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, নিতাই রায় চৌধুরী, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, খন্দকার মুক্তাদির চৌধুরী, জাকারিয়া তাহের সুমন, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, শেখ রবিউল আলম, আরিফুল হক চৌধুরী, আফরোজা খানম রিতা, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, শামা ওবায়েদ ও ইশরাক হোসেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, ডা. জাহেদ উর রহমান ও মাহদী আমিন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনামুল হক চৌধুরী, জিয়া উদ্দিন হায়দার ও রাশেদুল হক। এ ছড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি এমপিদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন সামনে রেখে দলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা শুরু করেছে বিএনপি। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় গুলশানে দলীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এ কর্মশালার উদ্বোধন করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় এমপিদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আছেন। রুদ্ধদ্বার এ কর্মশালার উদ্বোধনী পর্বে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ২০৯ জন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। যার মধ্যে ১৪৬ জন প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে নতুন এমপিদের সংসদীয় বিধিবিধান ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নেই।
দলের এক সিনিয়র নেতা জানান, কীভাবে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করতে হয়; বিল প্রণয়ন ও পর্যালোচনা করে আলোচনায় অংশ নিতে হয়; নিজের এলাকায় সমস্যা কীভাবে তুলে ধরবেন; রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণের কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হয় এবং সংসদ অধিবেশনে এমপিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়ে কর্মশালায় দলের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি নেতারা জানান, কর্মশালায় সংসদের কার্যপ্রণালি, আচরণবিধি, বিল প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, বাজেটসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ ও সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান নবনির্বাচিত এমপিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। অভিজ্ঞ এমপিরা তাঁদের অভিজ্ঞতা নতুনদের সামনে তুলে ধরেন। সরকার ও সরকারি দলের সদস্যদের দক্ষতা বাড়ানোই এ কর্মশালার উদ্দেশ্য। ১২ মার্চ বেলা ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এ অধিবেশন আহ্বান করেন। অধিবেশন সামনে রেখে নতুন এমপিদের প্রস্তুত করতেই এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে বিএনপি। অভিজ্ঞ সাবেক আমলা, একাডেমিশিয়ান ও সাবেক এমপিদের মাধ্যমে নতুনদের দায়িত্ব, মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংসদীয় রেওয়াজ ও মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে কৌশলগত ভূমিকা কেমন হবে, তা তুলে ধরা হচ্ছে এ কর্মশালায়। বিএনপির সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এমপিদের স্থানীয় উন্নয়ন, নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। দুদিনের কর্মশালায় প্রথম দিন গতকাল সকালের পর্বে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিকালে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা ও ফরিদপুর বিভাগের একাংশ অংশ নিয়েছে। আজ শেষ দিন সকালের পর্বে ঢাকা জেলা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও ঢাকা বিভাগের বাকি এমপি এবং বিকালের পর্বে সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভাগের এমপিরা অংশ নেবেন।