হাজারো প্রাণের বিনিময়ে দেশ গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘সব শহীদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমাদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আরও সমৃদ্ধ হতে হবে। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ।’ গতকাল সকালে ‘জাতীয় পাট দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
পাটপণ্যকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিয়ে নতুন সম্ভাবনার সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘স্বল্পমূল্যে পাটের ব্যাগ তৈরি ও বিপণন করুন। বিশ্ব এখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। এ সম্ভাবনার সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগ পরিহারের আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘পাটপণ্যকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিন। সাশ্রয়ী মূল্যের পাটের ব্যাগ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করুন।’
রাষ্ট্রপ্রধান উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন, আধুনিক, মানসম্মত, নান্দনিক ও ব্যবহার উপযোগী সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য উদ্ভাবনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। পাট খাতে আধুনিক বিজ্ঞান ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘পাটজাত পণ্যে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্য আনতে হবে।’
তিনি পাট চাষিদের উন্নত প্রযুক্তির উচ্চ ফলনশীল চাষ পদ্ধতি অনুসরণ ও মানসম্মত আঁশ উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনাদের পণ্যের টেকসই মান সংরক্ষণ, নিত্যনতুন ডিজাইন ও ব্যবহার উপযোগিতাকে অগ্রাধিকার নিতে হবে। এ খাতে দক্ষ জনবল সৃষ্টি ও পাটপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, উদ্ভাবন, বৈচিত্র্য সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান, উচ্চমূল্য সংযোজন, শিল্পের আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং দেশবিদেশে বাজার সৃষ্টি ও সম্প্রসারণে পাট চাষি, শ্রমিক, উৎপাদক, শিল্পোদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক, নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি অংশীজনকে যথাযথ ভূমিকা রাখার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন যে বর্তমান জনবান্ধব সরকারের হাত ধরে পাট খাতের সোনালি দিন ফিরবে। সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। পাশাপাশি জনগণেরও ভাগ্যোন্নয়ন ঘটবে।
পাটকে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-গৌরবের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। সবাই মিলে পাট খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে আরও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও অনুরোধ করেন। তিনি জানান, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে রুগ্ণ ও বন্ধ পাটকলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে পাট খাতকে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও আধুনিকীকরণ, গবেষণা সম্প্রসারণ, উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবনসহ পাটের বহুমুখী ব্যবহারে নানান গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১০ দিনের মাথায় কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এতে ১১ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি লাভবান হয়েছেন। এতে পাটসহ কৃষি খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদন বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এ সিদ্ধান্ত কল্যাণকর অবদান রাখবে বলেও দাবি করেন। রাষ্ট্রপতি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথমবার সরকার গঠনের পরও ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদাসল মওকুফ করা হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমান কৃষি ও কৃষকবান্ধব সরকার আগামী পয়লা বৈশাখে পর্যায়ক্রমে কৃষক কার্ড বিতরণ বিতরণ শুরু করবে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, সাশ্রয়ী মূল্যে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ, ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বিমার সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ, কৃষি প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবহাওয়া ও বাজারসংক্রান্ত তথ্যসহ কৃষিসংশ্লিষ্ট সব বিষয় জানতে পারবেন বলেও জানান তিনি। রাষ্ট্রপ্রধান আশা প্রকাশ করেন, সরকারের নেওয়া এসব উদ্যোগের ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। পাট খাতে সুদিন ফিরে আসবে এবং অবারিত কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি জাতীয় পাট দিবস-২০২৬ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে নয় দিনের ‘পাট ও বহুমুখী পাটপণ্যের মেলা’র ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে পাট খাতে সামগ্রিক উন্নয়ন স্বীকৃতিস্বরূপ এবং এ খাতে নিয়োজিত সর্বস্তরের অংশীজনকে উৎসাহিত করতে মোট ১৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে বড় পর্দায় জাতীয় পাট দিবস-২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সচিব বিলকিস জাহান রিমি, পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নূরুল বাসির ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বাংলাদেশ জুট মিলস্ অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) সভাপতি আবুল হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।