রমজান মাস শুধু একটি সময় নয়; এটি ইমানের নবায়ন, আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মহাসুযোগ। আর এই রমজানের শ্রেষ্ঠ সাধক ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর জীবনই রমজানের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, তাঁর আমলই এ মাসের প্রকৃত ব্যাখ্যা। রমজান রসুলের সাধনার স্মৃতি বহনকারী এক নূরানি বিদ্যালয়, যেখানে প্রতিটি রোজা একটি পাঠ, প্রতিটি সেজদা একটি প্রতিজ্ঞা, আর প্রতিটি ইফতার একটি কৃতজ্ঞতার ঘোষণা।
রসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে ইবাদতে অন্য সব মাসের তুলনায় অধিক মনোনিবেশ করতেন। রমজানের শেষ দিকে তাঁর সাধনা আরও বাড়িয়ে দিতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের শেষ দশকে তিনি এত বেশি ইবাদত করতেন যে, অন্য সময় তেমনটি করতেন না। তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন, কোমর বেঁধে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যেতেন। এতে বোঝা যায়, রমজান তাঁর কাছে ছিল আত্মসমর্পণ ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ ঋতু। তাঁর সাধনার একটি অনন্য দিক ছিল কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। রমজানেই কোরআন নাজিল হয়েছে; তাই এ মাসে তিনি হজরত জিবরীল (আ.) এর সঙ্গে কোরআন পুনরাবৃত্তির অনুশীলন করতেন। এভাবে রমজানে তিনি দুবার কোরআন খতম করতেন। এটি আমাদের শেখায়- রমজান মানেই কোরআনের মাস; কোরআন ছাড়া রমজানের স্বাদ অপূর্ণ। রসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন দানশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ছিলেন, আর রমজানে তাঁর দানশীলতা প্রবাহমান বাতাসের চেয়েও দ্রুততর হতো।’ তিনি ক্ষুধার্তকে আহার দিতেন, অভাবীর পাশে দাঁড়াতেন, বন্দিদের মুক্ত করতেন। তাঁর কাছে রমজান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস ছিল না; ছিল সামাজিক সহমর্মিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধের মাস। রোজার প্রকৃত শিক্ষা তিনি নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়েছেন। তিনি সতর্ক করতেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অন্যায় কাজ ত্যাগ করতে পারে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁর জীবন দেখায়, রমজান মানুষকে সংযমী, সহনশীল ও ক্ষমাশীল করে তোলে। রমজানের শেষ দশকে এতেকাফের মাধ্যমে তিনি আমাদের নিভৃত সাধনার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দুনিয়ার কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে একান্তে রবের সান্নিধ্য খুঁজতেন। এতে আমরা শিখি- ব্যস্ত জীবনের মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর জন্য নির্জনে কাটানো প্রয়োজন। রমজান আমাদের সামনে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর এক আলোকোজ্জ্বল আদর্শ তুলে ধরে- ইবাদতে একাগ্রতা, কোরআনের সঙ্গে সখ্য, দান-সদকার প্রসার, চরিত্রের শুদ্ধতা ও আল্লাহভীতি। তাঁর স্মৃতি শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি বর্তমানের দিকনির্দেশনা। যদি আমরা তাঁর রমজানকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, পারি বাস্তবে প্রতিফলিত করতে- তবে আমাদের জীবনও তাকওয়ার দীপ্তিতে আলোকিত হবে ইনশা আল্লাহ।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।