জাতীয় সংসদে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের গুরুত্ব ও ভূমিকা অপরিহার্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন এক প্রত্যাশার আবহ তৈরি হয়েছে এরই মধ্যে। ইতোমধ্যে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অতীতের ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের মতো হবে না তাদের ভূমিকা। দলের নেতারা বলছেন, সংসদে তারা জনগণের অধিকারের বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন এবং জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবেন। দলটির একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের সঙ্গেও জামায়াত নেতাদের বৈঠকে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বৈঠকে দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদে গেলে তারা জনস্বার্থের প্রশ্নে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত ভূমিকা পালন করতে চান। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবেন না। প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, সংসদীয় জোটের নির্বাচিত এমপিরা আজকের সভায় উপস্থিত ছিলেন। আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছি। আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। ইতোমধ্যে আমরা ঘোষণা করেছি, আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই। তিনি বলেন, আমরা সব বিষয়ে বিরোধিতা করব না, আবার না বুঝে কোনো সহযোগিতাও করব না। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকার যে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেসব ক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। তবে দেশ ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়া হলে আমরা আমাদের দায়িত্ব অনুযায়ী ভূমিকা পালন করব। তিনি আরও বলেন, প্রথমে আমরা ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব এবং পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে আমরা প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদেও যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াব। আমরা চাই প্রথম ধাপেই সমস্যার সমাধান হোক। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই সনদেই আছে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিস মিল; পুরোটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, আমরা চাই জুলাই সনদের যে প্রস্তাব সে প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। এর আলোকে বিরোধী দলের যতটুকু পাওনা আমরা অতটুকু চাই, বেশি চাই না। জামায়াত আমির বলেন, প্রথম শপথ হয়েছে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। দ্বিতীয় শপথটি হয়েছে সংসদ সদস্য। আমরা দুই জায়গায় শপথ নিয়েছি। দুই জায়গায় আমরা স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত সরকারি দল প্রথম শপথ তারা নেয়নি। আমরা তাদের প্রতি আহ্বান জানাব, আসুন জুলাইকে সম্মান করুন। জুলাইকে সম্মান করলেই ২৪ থাকবে। বাংলাদেশে যারা ভোট প্রয়োগ করেছেন তাদের ৬৯ ভাগ মানুষের পক্ষে রাখা হয়েছে। এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। এর আগে রাজনৈতিক ব্যস্ততা থাকায় বিরোধী দলের বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই চলে যান বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন দলটির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। নাহিদ সংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। এরপর বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মু. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মনে করি, রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার অধিকার নেই। স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাঁকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছেন আমরা পরিষ্কার নই। এ বিষয়ে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলো কালকে দেখবেন।’
সংসদেই বিরোধী দলের অবস্থান ‘দৃশ্যমান’ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগের দিন বিএনপিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে এ আহ্বান জানান তিনি। এর আগে জামায়াত আমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিরোধীদলীয় জোটের বৈঠকে ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করা হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামাত আমির বলেন, এক্ষেত্রে সংসদ অধিবেশনেই বিরোধী দলের অবস্থান ‘দৃশ্যমান’ হবে। শফিকুর রহমান বলেন, সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনকে সামনে রেখে বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যদের এ বৈঠকে দেশ ও জাতির প্রত্যাশা পূরণে বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। আমরা আগেই পরিষ্কার করেছি, বিরোধী দল হিসেবে আমরা একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে চাই।