যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে গিয়ে ঠেকেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই পক্ষই। প্রণালির কৌশলগত এলাকায় মাইন বসাচ্ছে ইরান।
অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মাইন ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ আনছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানকে নজিরবিহীন পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে যুদ্ধের ১২তম দিনে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তেহরান, তেল আবিবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন অবকাঠামোগুলোতে বিধ্বংসী হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসাতে শুরু করেছে ইরান। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরে পাঠানো অ্যাভেঞ্জার-ক্লাসের মাইন ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ডিভাস্টেটর, ইউএসএস ডেক্সট্রাস, ইউএসএস গ্ল্যাডিয়েটর ও ইউএসএস সেন্ট্রি নিয়ে আরব সাগর পাড়ি দিচ্ছে বাণিজ্যিক জাহাজ ‘সিওয়ে হক’। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইন বসানোর কাজ এখনো খুব একটা ব্যাপকভাবে হচ্ছে না। গত কয়েক দিনে গুটিকয় মাইন বসানো হয়েছে। ইরানের হাতে এখনো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্র যুদ্ধযান ও মাইন স্থাপনকারী জাহাজ অক্ষত রয়েছে। ফলে দেশটি চাইলে এ জলপথে কয়েক শ মাইন ছড়িয়ে দিতে পারে। গত মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যদি মাইন বসানো হয়ে থাকে এবং সেগুলো সরানো না হয়, তবে ইরানকে নজিরবিহীন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে তেহরান যদি বসানো মাইনগুলো সরিয়ে নেয়, তা হবে সঠিক পথে এক বিশাল পদক্ষেপ। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিষ্ক্রিয় মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলো ধ্বংস করছে। আমরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সেগুলো নিশ্চিহ্ন করছি। সন্ত্রাসীদের হাতে হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি হতে দেব না। এর আগে আইআরজিসি সতর্ক করেছিল, এ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো হবে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এই পথে চলাচলের ঝুঁকির কারণে বর্তমান অবস্থাকে ‘ডেথ ভ্যালি’ বা মৃত্যু উপত্যকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গতকাল পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফলে জাহাজটি থেকে নাবিককে সরিয়ে নেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ব্রিটিশ মেরিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালিতে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘মায়ুরি নারি’ ওমানের ১১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে হামলার শিকার হয়। জাপানের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘ওয়ান ম্যাজেস্ট্রি’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহর ২৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজটির নাবিকরা নিরাপদে আছেন। এ ছাড়া দুবাইয়ের প্রায় ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে তৃতীয় আরেকটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজেও অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হেনেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩টি জাহাজে হামলার খবর পাওয়ার কথা জানায় ইউকেএমটিও। সংস্থাটি জানায়, জাহাজ নিয়ে এ ছাড়া আরও চারটি সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে আরব সাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত মোট ১৭টি ঘটনার তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে চলমান যুদ্ধের ১২তম দিন গতকালও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরসরায়েল ও ইরান। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, হামলা শুরুর পর গতকাল সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন অবকাঠামোগুলোকে। অন্যদিকে ইরানের রাজধানী তেহরানের বিমানবন্দরসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ও সরকারি অবকাঠামোগুলোতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, তারা তেল আবিবের দক্ষিণে অবস্থিত হায়েলা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া বির ইয়াকুব, পশ্চিম জেরুজালেম ও হাইফার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং বাহরাইনের মানামায় যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের ক্যাম্প প্যাট্রিয়ট ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে মোহাম্মদ আল-আহমদ এবং আলী আল-সালেম নৌঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের সরঞ্জামের হ্যাঙ্গার, আবাসন এবং সমাবেশ কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় দুটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে চারজন আহত হয়েছেন। টানা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এ অভিযানে নতুন প্রজন্মের ‘সুপার-হেভি খোররামশাহর’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কয়েক স্তরের সমন্বিত হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে ইরানের রাজধানী তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিক থেকে বড় বিস্ফোরণের শব্দ এবং আগুনের বিশাল কমলা আভা দেখা গেছে। এ ছাড়া তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় বিমান হামলা চলানো হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান হামলায় ইরানজুড়ে প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৯ হাজার ৭৩৪টি বেসামরিক স্থাপনা। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে হাসপাতাল, স্কুল এবং ত্রাণ সহায়তা কেন্দ্রও রয়েছে। এ ছাড়া রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি পরিচালিত ১৬টি স্থাপনাও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছে।
আহত হলেও নিরাপদ আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুদ্ধকালীন চোটে আহত হলেও বর্তমানে নিরাপদ ও সুস্থ আছেন। গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ও সরকারের উপদেষ্টা ইউসেফ পেজেশকিয়ান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক পোস্টে ইউসেফ পেজেশকিয়ান বলেন, আমি খবর পেয়েছিলাম যে মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে জানিয়েছেন, আল্লাহর রহমতে তিনি নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।
আবুধাবি ও তেল আবিবে দূতাবাস, দুবাইয়ে কনস্যুলেট বন্ধ করল অস্ট্রেলিয়া : অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও ইসরায়েলের তেল আবিবে অবস্থিত দূতাবাস এবং দুবাইয়ের কনস্যুলেটের কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সিনেটের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো, দেশে ও বিদেশে অস্ট্রেলীয়দের নিরাপদ রাখা। ইরানের বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল হামলা অস্ট্রেলীয়সহ সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি ইরানের : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। গতকাল ইরানের একটি ব্যাংকে হামলার পর ইরানের সামরিক বাহিনী হুমকি দিয়ে বলেছে, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে ইরান। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া যৌথ কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি বলেছেন, ইরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক এবং ব্যাংকিং স্বার্থে হামলা চালাবে।
ব্যর্থ অভিযানের পর সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনী এবং নিষ্ঠুর ইহুদিবাদী ইসরায়েল ইরানের একটি ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তিনি বলেন, এমন অবৈধ ও নজিরবিহীন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শত্রুরা আমাদের এ অঞ্চলে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংকগুলোতে আঘাত করতে বাধ্য করছে।