গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যৌথ বিমান হামলা শুরু করে তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, এটি আরেকটি একতরফা যুদ্ধ-সহসাই শেষ হবে। যেখানে ইরানের পতন ঘটবে খুব সহজেই। কিন্তু যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন এটা স্পষ্ট যে ইরান আক্রমণ সম্ভবত মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ইরান যুদ্ধ নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সহজে যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা দিতে পারছেন না। যুদ্ধ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে। আর যুদ্ধ বন্ধ করলেও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। এখনো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায়নি, অতীতের মতো বড় ব্যর্থতা বলা যায়, যেমনটা হয়েছিল ট্রাম্পের পূর্বসূরি জনসন ও বুশের ক্ষেত্রে। তবে কিছু সতর্কসংকেত দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই যুদ্ধের সময় যত বাড়ছে ততই গোটা বিশ্ব এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। নানামুখী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট ক্রমশ প্রকট আকার ধারণ করছে।
কম ক্ষেত্রেই যুদ্ধে কোনো এক পক্ষ স্পষ্টভাবে জয়ী হয় না, আর বেশির ভাগ সময়েই সব থেকে বেশি মূল্য চুকাতে হয় সাধারণ মানুষকে। ইরানের ওপরে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল এবং সারা বিশ্বজুড়েই নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই হাজার হাজার মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরেও এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও তেলের দাম বেড়ে গেছে, কোথাও আবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় সাধারণ ক্রেতা এবং ব্যবসায়ীদের খরচও বেড়ে গেছে।
প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে চলমান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে না এলেও এর ছাপ যে এখানেও পড়ছে সেটি স্পষ্ট। কারণ বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। ওই অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম হাব হওয়ায় এই যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে গোটা বিশ্বে।
জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জ্বালানি তেল নিয়ে যে দেশে অস্থিরতা চলছে তা পেট্রোল পাম্পের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। যদিও সরকার বারবার বলছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে সরকারকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ভাবতেই হবে। কারণ এই চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নিতে পারবে না।
জ্বালানি তেল বা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে বাস-ট্রাকের ভাড়া যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বৃদ্ধি পেতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কিংবা সারের দামও। ফলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে, যার প্রভাব পড়তে পারে চাল, ডাল আর সবজির বাজারেও।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারে আমদানি করা ভোজ্য তেল, গম কিংবা চিনির দাম। যার ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিংবা শৌখিন পণ্যে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পৌঁছে যেতে পারে এ দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার কারণে দেশের অর্থনীতি হঠাৎই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে আরব আমিরাতের মজুত রাখা জ্বালানি ট্যাঙ্কারে। নিজেদের বেশ কয়েকটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি স্থাপনায় ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছে কাতার। হামলা হয়েছে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারেও। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড।
তারা সতর্ক করেছে যে হরমুজ প্রণালি ‘কেউ পার করার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে।’
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অস্থির সময় পার করছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জ্বালানিমূল্যে।
তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড বৃহস্পতিবার ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হামলার প্রথম দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে তুলনা করলে ওই দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য শিগগিরই ১০০ ডলারে পৌঁছাবে।
এমন প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা না থাকায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই আসে। যার বড় জোগানদাতা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান।
এই দেশগুলো থেকেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি কেনা হয়।
কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ, যার বেশির ভাগই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জ্বালানিও আসে এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই। অর্থাৎ জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎসংকট এবং সেখান থেকে কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, সব মিলিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে সরকারকে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে অনেক বেশি ডলার খরচ করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়ে, যা মুদ্রার বিনিময়হার বা ডলারের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বাজারে যায়। বিশেষ করে পোশাক খাতের ওপর ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর কিংবা সুয়েজ খালের মতো রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হলে জাহাজ কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
তারা বলছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ইতোমধ্যে অর্ডার সংকুচিত করেছে অনেক দেশ। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে।
নিরাপদ রুটে পণ্য পাঠাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা রপ্তানির লিড টাইম বাড়িয়ে দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদি দুই ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। কেবল পোশাক রপ্তানি নয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে অন্যতম কৃষি উপকরণ সারের ওপরও। কারণ বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের একটি বড় অংশ আমদানি করে কাতার ও সৌদি আরব থেকে। এ ছাড়া দেশীয় কারখানায় সার উৎপাদনের জন্যও জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানিসংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনও প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবাসী আয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত, যাঁর সিংহভাগই রয়েছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের বাইরে বসবাস করা বাংলাদেশি অভিবাসীর অন্তত ৬০ লাখেরই গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এরই মধ্যে নানা সংকট তৈরি হয়েছে এই প্রবাসীদের। ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে ইচ্ছুক অনেক বাংলাদেশি নিজ দেশেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এ ছাড়া যুদ্ধাবস্থা চলমান থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই অন্য দেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নীতি পরিবর্তন করতে পারে। এতে করে নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধের শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়াসহ নানা জটিলতায় পরবর্তী সময়ে আর দেশগুলোতে যাওয়া হবে কি না, এমন শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অতীতে কুয়েত যুদ্ধের সময় হাজার হাজার বাংলাদেশিকে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হলে তা দেশের বেকারত্ব সমস্যার ওপর পাহাড়সম চাপ তৈরি করবে। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের দিকে যেন ধেয়ে আসছে এক মহাসংকট।
মাত্র এক মাস আগেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই নানা রকম জটিল অর্থনৈতিক সংকট পেয়েছে। গত দেড় বছর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছে। এ সময় বাংলাদেশ বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা দিয়েছে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। মব সন্ত্রাস, মামলা বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তারা হতাশ। তাঁরা ব্যবসাবাণিজ্যে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রতিহিংসার শিকার। তাঁদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে চরিত্রহননের নোংরা খেলা হয়েছে। অর্থনীতিতে নেতিবাচক যত কাজ করা যায়, তার সবই করেছে বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একজন ব্যবসাবান্ধব অর্থমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে এই সরকার তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল স্পষ্ট করেছে। এরপর অর্থনীতি ধ্বংসের অন্যতম খলনায়ক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক দুর্নীতিবাজ গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সরিয়ে দিয়ে, এই সরকার জানিয়ে দিয়েছে যে তারা বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি গড়তে চায়। বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চায়। সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই অতিদরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে ইরান যুদ্ধের কারণে। এর ফলে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি নতুন চাপে পড়বে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুরোপুরি রেমিট্যান্সনির্ভর হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রভাব ফেলবে। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তির কারণে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারবে না। সব মিলিয়ে একটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সরকারকে লড়াই করতে হবে। আর এই লক্ষ্যে এখন থেকেই সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারের একার পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই অর্থনীতির সব স্টেকহোল্ডারের মতামত নিতে হবে সরকারকে। সবাইকে আস্থায় নিয়ে কাজ করতে হবে সংকট মোকাবিলায়। এখন কে কোন পক্ষ তা দেখার সুযোগ নেই। যারা বিনিয়োগকারী, তারা যে মত ও পথের হোক না কেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। বিগত সরকারের আমলে বেসরকারি খাত ধ্বংসের যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যেমন ব্যবসায়ীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, দুদকে হয়রানিমূলক মামলা, মিথ্যা হত্যা মামলা, এসব দ্রুত বাতিল করে বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জন করতে হবে। বেসরকারি খাত পাশে থাকলে সরকারের জন্য সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে সংকট মোকাবিলায় জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠন সময়ের দাবি। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই আতঙ্ক দূর করতে হবে। জনগণকে বাস্তবতা উপলব্ধি করাতে হবে সরকারকে। এজন্য সরকারকে স্বচ্ছতার সঙ্গে সত্য প্রকাশ করতে হবে। জ্বালানিসংকট কিংবা আসন্ন অর্থনৈতিক সংকট সরকারের সৃষ্ট না। তাই সব নাগরিকের মধ্যে সহনশীলতা ও কৃচ্ছ্র মনোভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
এই কঠিন সময়ে সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে সবার আগে। যেমন আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎসংকট হবেই। লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা কেমন হবে- জনতুষ্টির জন্য সাধারণ নাগরিকদের বিদ্যুৎ দিয়ে কী শিল্প কলকারখানায় লোডশেডিং করা হবে? তেমনটা করা হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। অর্থনৈতিক সংকট বাড়বে। শহরে বিদ্যুৎ বেশি দিয়ে গ্রাম অন্ধকার রাখলে আসন্ন বোরো মৌসুমে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই সরকারকে জনগণের সন্তুষ্টির চেয়ে দেশের বাস্তবতা ও চাহিদা বিবেচনা করতে হবে। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক ভর্তুকি দিচ্ছে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ভর্তুকি দেওয়া উচিত কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে। এই সংকটের সময়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে সব অনুৎপাদনশীল খাতের ব্যয় কমাতেই হবে। একটি নতুন নির্বাচিত সরকার প্রথম দিকে দেশের স্বার্থে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখন সরকারকে অবশ্যই কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের মানুষের জন্য এসব সিদ্ধান্ত আপাত দৃষ্টিতে অজনপ্রিয় মনে হলেও শেষ বিচারে এই বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর বিবেচিত হবে।