ইরানের আক্রমণ এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকায় নিরাপত্তার কারণে সৌদি আরবসহ ১২ দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ থেকে এ নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, আলজাজিরা। ওয়াশিংটন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনায় বলেছে, অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য নতুন সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইরানের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনা, বিচ্ছিন্ন হামলা ও সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবসহ অন্তত ১২ দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত দেশটি ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও পুলিশ সদর দপ্তর : ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাঁচ দফা আঘাত হেনেছে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নানান স্থাপনায়। এ সময় বিস্ফোরণে কাঁপতে থাকে দেশটির রাজধানী। শনিবার রাত থেকে এ হামলা চালানো হয়। গতকাল পাওয়া খবর অনুযায়ী, রাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছাড়াও সকাল থেকে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ইসরায়েলের বিশেষ পুলিশ ইউনিট ‘লাহাভ ৪৩৩’-এর সদর দপ্তর এবং গিলাত প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরব ও আমিরাতেও আঘাত হেনেছে। আরেক খবরে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মিত্র দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তাতে তেমন সাড়া মেলেনি। এতে অনেকটাই হতাশা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। সূত্র : আলজাজিরা, রয়টার্স, এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি
সৌদি আরব-আমিরাতে হামলা চালিয়েছে ইরান : গতকাল ফের সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলদাফরা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এ বিষয়ে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলদাফরা বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও অজ্ঞাতসংখ্যক ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়।
ইরানি সূত্র জানিয়েছেন, ইরানের তেলের প্রধান ঘাঁটি খারগ আইল্যান্ডে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল। এ কারণে গতকাল দুবাইতে একাধিক হামলা হয়েছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এ সময় তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে দুবাই মেরিনা এবং আল সুফৌসংলগ্ন এলাকায়।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ফুজাইরা তেল টার্মিনালেও হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে সেখানে তেল তোলার কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফুজাইরা কেন্দ্রে হামলার কারণে আগুন ধরে যায়। ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা গেছে।
নেতানিয়াহুকে হত্যার অঙ্গীকার : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার অঙ্গীকার করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গতকাল বাহিনীর নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত বিবৃতিতে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, যদি এখনো জীবিত থাকেন তাহলে তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে নেতানিয়াহুকে ধাওয়া করবে এবং তাঁকে হত্যার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য বন্ধ : মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি এখনো বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এ প্রণালি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএসএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, অন্য দেশগুলোর জাহাজের চলাচলে ইরান কোনো বাধা দিচ্ছে না। তিনি বলেন, অনেক ট্যাংকার ও জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালি পার হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই নিজে থেকে তা এড়িয়ে চলছে। এতে ইরানের কিছু করার নেই।
সহযোগিতা চেয়ে ট্রাম্প হতাশ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মিত্র দেশগুলোর কাছে যে সহযোগিতা চেয়েছিলেন, তাতে দৃশ্যত কোনো সাড়া মেলেনি। তিনি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে পার করাতে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কোনো দেশই প্রকাশ্যে ট্রাম্পের এ আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এ বিষয়ে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য বর্তমানে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে।’ মার্কিন গণমাধ্যমকে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, বেইজিং শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে এবং স্থিতিশীল ও নির্বিঘ্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সব পক্ষের দায়িত্ব। জাপানের কর্মকর্তারা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রাম্পের আহ্বানে জাপান জাহাজ পাঠাবে না। তাঁদের ভাষায়, ‘জাপান নিজস্ব সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া জানায়, স্বাধীন বিবেচনাই এখানে মূল বিষয়।’ ফ্রান্স জানিয়েছে, তারাও কোনো জাহাজ পাঠাচ্ছে না। এক্সে দেওয়া পোস্টে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘না, ফরাসি বিমানবাহী রণতরি ও তার বহর পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে।’ অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় গতকাল জানিয়েছে, ট্রাম্পের আহ্বান সতর্কভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা হবে। খবরে বলা হয়, এ বাস্তবতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হতাশা প্রকাশ করেছেন।
যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের কাছে দেনদরবার : অন্তত দুটি দেশ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করছে। একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে দেনদরবার করে চলেছে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ। কিন্তু ট্রাম্প কোনো আলোচনাতেই আগ্রহী নন। জানা গেছে, ওমান এবং মিসর যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওমান বারবার হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ট্রাম্প আগ্রহী নন। এক সিনিয়র হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এখন কোনো মধ্যস্থতায় আগ্রহী নন। আমরা আমাদের অভিযান চালিয়ে যাব। হয়তো মধ্যস্থতার জন্য কোনো একদিন আসবে, কিন্তু সেটা এখন নয়।’