অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী গতকাল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি পাস হওয়ায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে।
এ ছাড়া জুলাই গণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণে জুলাই গণ অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন ও জাতির পিতার পরিবারের বিশেষ নিরাপত্তা আইন বাতিলসহ ১৩টি বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গতকাল সংসদ অধিবেশনের ১১তম দিনে তিন দফায় বিলগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলগুলোর বিশেষ কমিটির কোনো প্রস্তাব না থাকায় সরাসরি পাস হয়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং মন্ত্রীর পক্ষে প্রতিমন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপন করেন। এর মধ্যে তিনটি বিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
‘সরকারি হিসাব নিরীক্ষা আইন, ২০২৬’, প্রোটেকশন অ্যান্ড কনসারভেশন অব ফিস (এমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি জামালপুর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বিল সংসদে পাস করা হয়। এ বিলটিতে শেখ হাসিনার নাম বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
পাস হওয়া অপর বিলগুলো হচ্ছে- ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাষণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬’ ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা রহিতকরণ আইন, ২০২৬’, স্থানীয় পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’ পরিত্যক্ত বাড়ি (সম্পূরক বিধানাবলি) আইন, ২০২৬’ ও কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল ২০২৬।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তিনটি বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এগুলো হচ্ছে-বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন) বিল ২০২৬, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল ২০২৬ ও বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অব্জল (রহিতকরণ) বিল ২০২৬।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকছে : অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি পাস হওয়ায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে এর ওপর আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বিলটি পর্যালোচনার জন্য সময় চেয়ে বলেন, আমরা মাত্র ২-৩ মিনিট আগে বিলটি হাতে পেয়েছি। আমাদের এটি বিস্তারিত বোঝার জন্য সময় দেওয়া উচিত। জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, বিলটি পাসের জন্য নির্ধারিত চূড়ান্ত পর্যায়ে এখন আর নতুন করে আপত্তি জানানোর বা সংশোধনী দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিলটি পাসের জন্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বলেন।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণহত্যার জন্য দায়ী সংগঠনগুলোর বিচার নিশ্চিত করতেই আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে এই ইস্যুতে জনমত তৈরি করেছিল। এ আইনের মাধ্যমেই তাদের (আওয়ামী লীগের) নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। তারপরও বিলে যদি কোনো পক্ষের আপত্তি থাকে, তবে তা সংশোধনী প্রক্রিয়ার প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপেই জানানো উচিত ছিল, তখন আলোচনার সুযোগ ছিল। এরপর স্পিকার এ বিষয়ে রুলিং দেন এবং পুনরায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিলটি পাসের প্রস্তাব করার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে বিলটি পাস হয়।
পাস হওয়া বিলের বিধান অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মিছিল-সভা-সমাবেশ করতে পারবে না, দলটির কার্যালয় বন্ধ থাকবে, ব্যাংক হিসাব জব্দ হবে, পোস্টার-ব্যানার প্রচার করতে পারবে না, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিতে পারবে না, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং সংবাদ সম্মেলন করতে পারবে না দলটি। নিষিদ্ধ সংগঠন এসব কার্যক্রম পরিচালনা করলে ৪ থেকে ১৪ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি বলেছিল, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয় তারা। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিএনপি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশকে’ আইনে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। অধ্যাদেশটি সংশোধন করে শাস্তির বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের ভিত্তিতে কার্যকর ছিল। সংসদের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে আইন হিসেবে পাসের সুপারিশ করে।
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে আইন পাস : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উত্থাপিত এ-সংক্রান্ত ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল-২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এর আগে সংসদে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তুলে ধরেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণ অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে। এ ছাড়া নতুন কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণ অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা আইনত বারিত (নিষিদ্ধ) হবে। আরও বলা হয়েছে, কোনো গণ অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার কারণে করা হয়ে থাকলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকার নিযুক্ত কোনো আইনজীবী এই প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করবেন। এ আবেদনের পর আদালত ওই মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম নেবেন না। তা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতে খালাসপ্রাপ্ত হবেন। বিলে বলা হয়, এই বিধান সত্ত্বেও কোনো গণ অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণ অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন এই অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে।
বিসিবি নিয়ে পাল্টাপাটি বক্তব্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপনকালে আপত্তি জানানোর জন্য ফ্লোর নেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ইনডেমনিটিটা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপরে নির্ভর করবে। অথচ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশটা ইতোমধ্যে ল্যাপস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশন যদি ২০০৯ সালের অনুযায়ী চলে, তাহলে সেটা পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত একটা মানবাধিকার কমিশন হবে।
বিরোধীদলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগ্নভাবে দলীয়করণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে দখল করা হয়েছে। বিসিবি এখন আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এটা নাই। এটা বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বায়ত্তশাসিত না করা হলে আরেকটি বাপের দোয়া কমিশন দেখতে পাব। তিনি আরও বলেন, কমিশনকে যদি আমরা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখি এবং তাকেই যদি আমরা জুলাই গণ অভ্যুত্থানের কার্যক্রমগুলোকে বিচারের এবং নিরীক্ষণের দায়িত্ব দেয়, সেক্ষেত্রে এই নিরীক্ষণ কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ক্রিকেট বোর্ডসহ সারা দেশের ক্লাবগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ইনকোয়ারি করেছে, তদন্তের পর বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) তামিম ইকবালের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। তিনি একজন খেলোয়াড়। এখানে বাপের দোয়া, মায়ের দোয়া কমিটি করিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে সারা বাংলাদেশের জেলা কমিটিগুলোকে প্রভাবিত করেছেন। বাংলাদেশে যেগুলো নিবন্ধিত ক্লাব ছিল, সেগুলোকে সরকারি ক্ষমতার মাধ্যমে প্রভাবিত করা হয়েছে এবং হাই কোর্টে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্রিকেট বোর্ডের একটি বডি গঠন করা হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছে, কী কী অনিয়ম হয়েছে তা খুঁজে বের করার জন্য। সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেওয়ার পর তারা জানাল যে এখানে যথেষ্ট অনিয়ম হয়েছে। এরপর একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনসহ অন্যান্য বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জাতির পিতার পরিবারের বিশেষ নিরাপত্তা আইন বাতিল করে বিল পাস : ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’ রহিত করে জাতীয় সংসদে বিল পাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শেখ পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধাদি বাতিল হলো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কেবল একটি পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য আইনটি করা হয়েছিল, যা ছিল একটি সুস্পষ্ট বৈষম্য। এই বৈষম্য দূর করতে অন্তর্বর্তী সরকার আইনটি রহিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশটিই এখন স্থায়ী বিল আকারে সংসদে পাস করা হলো। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা এ আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবিত দুই কন্যা এবং তাদের সন্তানদের জন্য আজীবন বিশেষ নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় বাসভবনসহ নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা ছিল। বুধবার বিলটি পাসের মাধ্যমে সেই আইনি বাধ্যবাধকতা ও সুবিধা বিলুপ্ত হলো।