জাতীয় সংসদে গতকাল সরকার ও বিরোধীদলীয় এমপিদের পাল্টাপাল্টি বিতর্কের মধ্য দিয়ে ২৪টি বিল পাস করা হয়। এ নিয়ে গত ১৩ দিনে সংসদ অধিবেশনে মোট ৯১টি বিল পাস হলো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়।
গতকালও সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। তারা সরকারি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশগুলোর অনুমোদন নিয়ে সরকারি দলের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনেন। সরকারি ও বিরোধী দলের বিতর্কের একপর্যায়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে আমরা দুঃখ নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি। ভবিষ্যতে আবার দেখা হবে।’
জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ অনুমোদন নিয়ে বিতর্কের শুরু। অধ্যাদেশটি হুবহু অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। কিন্তু সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এমন তিনটি সংশোধনী এনে বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ। বিল পাসের পর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, এখানে সংশোধনী আনার মাধ্যমে সরকারি দল রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ করেছে। দিনদুপুরে ছলচাতুরির মাধ্যমে সংশোধিত আকারে বিলটি পাস করা হয়েছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংশোধনী একজন বেসরকারি সদস্য এনেছেন। সরকার আনেনি। প্রয়োজনে পরে এ বিলটি আবার সংশোধন করা যাবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে বিতর্কের একপর্যায়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এর আগে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিল’ পাসের সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা বিলের কপি সময়মতো হাতে না পাওয়ায় স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও ক্ষোভ জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিলের বিষয়বস্তু না বুঝে সংসদ সদস্য হিসেবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়া অপরাধের শামিল।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিল : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের গণ অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিলাদি সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের জন্য জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্দেশ্যে ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গতকাল সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি পাসের বিষয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা আপত্তি জানালেও তা বিধিসম্মত না হওয়ায় তা গ্রহণ করেননি স্পিকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ৯৮টি অধ্যাদেশ সংশোধনী ছাড়াই পাসের রাজনৈতিক সমঝোতা ভেঙে ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস করায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল। এই প্রক্রিয়াকে ‘দিনেদুপুরে রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ ও ‘প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মহোৎসব’ বলে অভিহিত করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের নজিরবিহীন এই দলীয়করণের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের এখানে (সংসদে) থাকার কোনো দরকার নেই। আমি আহ্বান জানাব, এই সংশোধনী বাদ দিয়ে বিশেষ কমিটিতে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সেই অনুযায়ী বিলটি পাসের ব্যবস্থা করা হোক। সবকিছু সরকারের গুন্ডাবাহিনী বা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে কেন থাকতে হবে?’
জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন বিল পাস : ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে পাস হয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ, পুনর্বাসনসহ গণ অভ্যুত্থানের মর্ম ও আদর্শকে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এবং এ-সংক্রান্ত ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বিলটি উত্থাপন করা হয়। বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
এটা শাহবাগ নয়, পার্লামেন্ট-হাসনাত আবদুল্লাকে স্পিকার : সংসদে উত্তেজিত হাসনাত আবদুল্লাহকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘এত অসহিষ্ণু হলে চলবে না মিস্টার আবদুল্লাহ। এটা শাহবাগ নয়, পার্লামেন্ট। এখানে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে, শুনতে হবে।’ ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন, ২০২৬’ বিল পাসের পর বিরোধী দলের আপত্তি নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনার সময় স্পিকার রুলিং দেন।
জামায়াত এমপিকে সতর্ক করলেন স্পিকার : ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’ পাসের সময় সংসদে হঠাৎ দাঁড়িয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংরক্ষণের বিষয়ে কথা বলতে চান। তখন স্পিকার তাঁকে প্রশ্ন করেন, তিনি কোন বিলের ওপর আপত্তি জানাতে চান। সংসদ সদস্য জানান, তিনি ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ নিয়ে কথা বলতে চান। তখন স্পিকার বলেন, ওই নামে কোনো বিল তখন পর্যন্ত সংসদে উত্থাপনই হয়নি। তিনি ওই সংসদ সদস্যকে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠায় বিল পাস : রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে একটি অভিন্ন একাডেমিক কাঠামোর আওতায় এনে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম তদারকি করা সম্ভব হবে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সংসদ গ্যালারিতে শিক্ষার্থীদের ১৫০ আসন : জাতীয় সংসদ গ্যালারিতে অনূর্ধ্ব-১২ বছরের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০টি আসন রয়েছে। সম্প্রতি আরও ১০০সহ মোট ১৫০ আসন শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদের দর্শনার্থী গ্যালারিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ আসন বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে পত্র লেখেন স্পিকারের কাছে। স্পিকার এ আবেদন মঞ্জুর করেছেন। ফলে এখন থেকে ১৫০ শিক্ষার্থী সংসদের কার্যক্রম সরাসরি দেখার সুযোগ পাবে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক চর্চার রীতির সঙ্গে পরিচিত করাবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে নৌবিহারে যেতেন যাতে তারা রাষ্ট্রের সম্পদ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমিও চাই জেন-জিরা রাষ্ট্র সম্পর্কে জানুক, রাজনীতিসচেতন হোক।’