গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। একটি সরকার জনগণের কাছে যত বেশি স্বচ্ছ থাকবে, ততই সেই সরকার জনবান্ধব হবে। একইভাবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কিছু স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয় যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এসব প্রতিষ্ঠান সরকারকে চাপে রাখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মাধ্যমে একটি সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য জরুরি। এই চেক অ্যান্ড ব্যালান্স (Checks and Balances) হলো এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা, যেখানে সরকারের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ-এই তিন শাখার ক্ষমতা একে অপরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো একটি বিভাগ যেন অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্জন করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে এবং গণতন্ত্র ও ক্ষমতার সমতা বজায় থাকে। তাই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বিচার বিভাগ গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পার্লামেন্ট বা প্রেসিডেন্ট কিংবা নির্বাহী বিভাগ যেন স্বেচ্ছাচারিতা করতে না পারে সেজন্যই বিচার বিভাগ থাকে জন-অধিকারের পাহারাদার হিসাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি বড় নীতি ও নির্বাহী আদেশ মার্কিন আদালত বাতিল বা স্থগিত করেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর বিশাল শুল্কারোপ, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ এবং ফেডারেল অনুদান ও ঋণ স্থগিতের নির্দেশ। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এই ক্ষমতার ভারসাম্যে গণতন্ত্রকে টেকসই করে, করে শক্তিশালী। শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতাই গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য জরুরি নয়, এর পাশাপাশি কিছু স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আধুনিক গণতন্ত্রে সুশাসন ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান জরুরি।
অতীতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে মূলত সব প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে যাওয়ার কারণে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে আমরা গণতন্ত্রের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ক্ষমতার পৃথকীকরণ করতে পারিনি। সংসদীয় গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রপতি শাসন- দুই ধরনের গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতাই এদেশের জনগণের আছে। বিগত ৫৫ বছরে আমরা দেখেছি, সরকার ও রাষ্ট্র একাকার হয়ে গেছে। যিনি ক্ষমতায় বসেছেন তার ইচ্ছায় বিচার বিভাগ চলেছে। সংবিধানে ন্যায়পালের বিধান থাকলেও কোনো সরকারই ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়নি। ২০০৫ সালের পর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গঠন করা হলেও, সবসময়ই তারা ছিল ক্ষমতাসীনদের একান্ত অনুগত। প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলো গড়ে তোলা হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে, ভিন্নমত দমনে এবং সরকারের পক্ষে মিথ্যা প্রচারের জন্য। তাই দীর্ঘদিন ধরে এদেশের মানুষ স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বতন্ত্র মানবাধিকার কমিশন এবং স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন চেয়েছে। কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণে কোনো সরকারই আগ্রহ দেখায়নি। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর সবাই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল ইউনূস সরকার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল নির্লজ্জভাবে। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা এবং তার লাঠিয়াল আইন উপদেষ্টা নির্ধারণ করে দিত কার জামিন হবে আর কার হবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে মব রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল ইউনূস শাসনামলে। হাজার হাজার মানুষকে বিনাবিচারে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এ সময় দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করা হয়েছিল সরকারের দমননীতির হাতিয়ার হিসেবে। দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দুদকে ব্যবহার করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। কথিত এগারো অর্থ পাচারকারী হিসেবে উদ্ভট তালিকা প্রকাশ তার বড় প্রমাণ। বিভিন্ন ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জব্দ করে বেসরকারি খাত অচল করে দেয়। ইউনূস সরকার। ইউনূস সরকারের আমলে এক বছরের বেশি সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অকার্যকর হয়েছিল। ইউনূস সরকার বিদায় বেলায় এসে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত একটি অধ্যাদেশ জারি করে। রাজনৈতিক দল এবং আন্তর্জাতিক চাপে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধন করে।
সম্প্রতি বিএনপি সরকার এ সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেনি। ফলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়েছে। এনিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে সংশয়। বিএনপি সরকার কি তাহলে পুরোনো পথেই হাঁটছে?
জাতীয় সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে বিল দুটি পাস হয়। ফলে বিচার বিভাগ আগের অবস্থায় ফিরছে; বিচারক নিয়োগে আর আইন থাকছে না, বিলুপ্ত হচ্ছে স্বতন্ত্র সচিবালয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং অধিকতর যাচাইবাছাই করে পরে আইন প্রণীত হবে। অন্তর্বর্তী নিয়োগপ্রাপ্ত ২৫ জন বিচারক অবশ্য বৈধ থাকবেন। তবে, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার বাদী মাসদার হোসেন বলেছেন, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের ফল ভালো হবে না। উল্লেখ্য, ‘সরকার বনাম মাসদার হোসেন’ মামলার রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ এ মামলায় ১২ দফা নির্দেশনা দেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে পৃথক করা এবং বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কিন্তু অতীতের কোনো সরকারই বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করতে চায়নি। আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা আইনটি সংশোধনের পর নতুন করে উত্থাপন করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু বিচার বিভাগকে একধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। উচ্চ আদালতে বিচারক সংকট তীব্র। মামলার চাপে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকারের নিজের স্বার্থেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালে। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা, কমিশনের সদস্য বাড়ানোর বিধান করা হয়েছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন দুদকের তিন সদস্যের কমিশন। এরপর প্রায় দেড় মাস হতে চলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এখনো কমিশনশূন্য। এর মধ্যে অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন এখন রীতিমতো অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য তো নয়ই সরকারের জন্যও ইতিবাচক নয়।
জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশন আইনের যে সংশোধনী এনে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছিল তা বাতিল হয়ে গেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর পদত্যাগ করেছেন কমিশনের সদস্যরা। পদত্যাগের পর তাঁরা একটি খোলা চিঠিও লিখেছেন, যেখানে এই অধ্যাদেশ বাতিলে নতুন সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবেই’ আগের কমিশন আর নেই। এনিয়ে সুশীল সমাজের সমালোচনার মুখে সরকারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের এ অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করা হলেও এ বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সংসদে নতুন বিল আনা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ যে ১৬ অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন বা অননুমোদন করা হয়নি, সেগুলো আরও যাচাইবাছাই করে নতুন বিল আনার কথা বলা হয়েছে। তবে কোন বিল কবে আনা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। জনগণের প্রত্যাশা, বিপুল ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার এই আইন প্রণয়নে বিলম্ব করবে না। এনিয়ে যত কালক্ষেপণ করা হবে, তত বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে বিরাজনীতিকীকরণের পক্ষের শক্তি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার অভাবে সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা এই আইন প্রণয়নে দেরি করলে দুর্বল হবে গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্র দুর্বল হলে ক্ষতি হবে জনগণের, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বিএনপির।