মাদকের অন্ধকার জগতে যুক্ত হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল। মাদক মাফিয়ারা নিজেদের নিরাপদ রাখতে করপোরেট ধাঁচে আন্ডারওয়ার্ল্ডে চালু করেছে এ নিয়ম। এ পদ্ধতিতে গডফাদাররা সরাসরি সামনে না এসে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্লিন প্রোফাইল ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছে মাদক ব্যবসা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক মানজুরুল ইসলাম বলেন, কিছু কিছু মাদক মাফিয়া আড়ালে থেকে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের তথ্য আমাদের কাছেও এসেছে। এ ধরনের বেশ কিছু তদন্ত আমরা করছি। যার মধ্যে পাঁচটি মামলা তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দেওয়া চার্জশিটগুলোতে মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক, অর্থ বিনিয়োগকারী, সহযোগিতাকারী এবং গডফাদারদের আসামি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নাজমুল হাসান বলেন, মাদক মাফিয়ারা নিজেদের আড়াল রাখতে প্রতিনিয়ত কৌশল পরিবর্তন করে। এটাও তাদের আড়াল করার কৌশলমাত্র। অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদক মাফিয়ারা নিজেদের আড়ালে রেখে নির্বিঘ্নে মাদকব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে করপোরেট ধাঁচের ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল অনুসরণ করছে। এ কৌশলে বড় মাদক মাফিয়ারা পর্দার আড়ালে থেকে মাদকের পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। চিহ্নিত মাদক মাফিয়ারা মিয়ানমারের মাদকের রাজধানী খ্যাত ‘শান স্টেট’ থেকে কুখ্যাত ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল হয়ে বিভিন্ন রুটে প্রবেশ করাচ্ছে মাদকের চালান। এসব মাফিয়া শুধু চালানের মূলধন এবং পাইকারি নিশ্চিত করে। পরে ওই চালান তুলে দেওয়া হয় লোকাল শেল্টারদাতা বা ফ্র্যাঞ্চাইজির হাতে। ফ্র্যাঞ্চাইজিরা প্রশাসন ম্যানেজ, মাদকের সেইফ হাউস (গুদাম) নিশ্চিত করা এবং পাইকারদের সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করে। বিনিময়ে শূন্য পুঁজিতে মাদকের চালানের উল্লেখযোগ্য অংশের লাভ পায় ফ্র্যাঞ্চাইজিরা। কক্সবাজার, টেকনাফ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় গত কয়েক মাসে নতুন নতুন মাদক ফ্র্যাঞ্চাইজির আবির্ভাব হয়েছে। যারা এলাকায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। কথিত এ ফ্র্যাঞ্চাইজিরা আবার নিজ নিজ এলাকায় লোকাল ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়োগ করছে। যারা বেকার কিংবা ক্লিন প্রোফাইলের ব্যক্তি। যাদের নেই অতীতের কোনো মামলার রেকর্ড। লোকাল ফ্র্যাঞ্চাইজিরাই মাদক বহন এবং বিক্রির কাজ করে। মাদক মাফিয়াদের এ কৌশল অবলম্বন করার কারণে মাদক সাম্রাজ্যে আবির্ভাব ঘটেছে নতুন মুখের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকা এসব তরুণ ও কিশোর এখন মাদক পরিবহনের মূল কারিগর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে বেকার যুবক ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বড় অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এ মরণখেলায় নামানো হচ্ছে। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত মাদকের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক ডনরা। টেকনাফ থেকে নাফ নদী পার হয়ে আসা মাদক পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে প্রথমে কক্সবাজার পৌঁছায়। সেখান থেকে লরি, কাভার্ড ভ্যান কিংবা যাত্রীবাহী বাসে করে চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানী ঢাকা ও উত্তরবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে। মাদক সাম্রাজ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।
তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাদক পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। একক আধিপত্যের বদলে তারা এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে কাজ করছে। মূল বিনিয়োগকারী বা গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালীদের লোকাল ডিলারশিপ বা ফ্র্যাঞ্চাইজি দিচ্ছে। এসব প্রভাবশালী কোনো অর্থ বিনিয়োগ ছাড়াই শুধু রাজনৈতিক শেল্টার এবং প্রশাসন ম্যানেজ করার বিনিময়ে পাচ্ছে মাদকের বিশাল লভ্যাংশ। ক্যারিয়ার বা বহনকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা সবসময় থাকছে আড়ালেই।