হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এক দিনের মাথায় আবার জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। শুক্রবার লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় পূর্বশর্ত অনুযায়ী ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। তবে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় আবারও প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
গতকাল প্রণালির কাছাকাছি একটি তেলবাহী জাহাজে গুলি চালিয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনী। ফলে জাহাজটি পিছু হটতে বাধ্য হয়। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামীকাল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ইরান এখনো দ্বিতীয় দফার বৈঠকের জন্য রাজি হয়নি বলে দেশটির গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। এদিকে ইরানকে চুক্তিতে আসতে বুধবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি না হলে ইরানে আবার হামলা শুরুর হুমকি দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় ক্ষুব্ধ তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সামরিক কমান্ডের বিবৃতিতে মার্কিন নৌ অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়, এ কারণেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন থেকে এ কৌশলগত নৌপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরমুখী এবং ইরান থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরিয়ে না দেবে, ততক্ষণ এ কড়াকড়ি বজায় থাকবে। ইরানের সামরিক বাহিনীর এ ঘোষণার পরপরই হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। ব্রিটিশ সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। দুটি গানবোট থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, গানবোটগুলো ইরানের আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ট্যাংকারের ক্যাপ্টেন বলেছেন, গানবোট থেকে কোনো হুঁশিয়ারি বার্তা ছাড়াই গুলি চালিয়েছে। তবে গুলিতে জাহাজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, ক্রু সদস্যরা নিরাপদে আছেন। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার মাঝেই আগামীকাল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা সোমবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে। আলোচনার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদের আজই ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য মিসর ও পাকিস্তান খুব জোরালোভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি। তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা এটি করতে পারব। শুধু আমাদের অঞ্চলেই নয়, বরং পুরো বিশ্বই এ যুদ্ধের কারণে ভুগছে।’ তবে ইরান এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি বলে দেশটির গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য : দ্বিতীয় দফার আলোচনার গুঞ্জনের মাঝেই পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যেকোনো উপায়ে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কবজায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে তেহরান জানিয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে কোথাও যাবে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান সবকিছুতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ও রয়েছে। পরে অ্যারিজোনায় নির্বাচনি জনসভায়ও ট্রাম্প এ দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। সেখানে তিনি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সব পারমাণবিক ধুলো (নিউক্লিয়ার ডাস্ট) নিয়ে নেবে। আপনারা জানেন পারমাণবিক ধুলো কী? আমাদের বি-২ বোমারু বিমানগুলো যে সাদা গুঁড়ো তৈরি করেছিল, সেটাই ওটা। আমরা যেকোনোভাবেই হোক এটা নিতাম, তবে ওভাবে (হামলার মাধ্যমে) নেওয়াটা একটু বেশি বিপজ্জনক।’ তবে নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা হয়নি বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান।
বুধবারের মধ্যে চুক্তি না করলে ইরানে আবার হামলা শুরু, ট্রাম্প : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আগামী বুধবারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতি শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইরানে আবার বোমা হামলা শুরু হতে পারে বলে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়াব না। তবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় থাকবে। ফলে একদিকে অবরোধ থাকবে, অন্যদিকে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের আবারও বোমা হামলা শুরু করতে হবে।’
প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ইরানের সর্বোচ্চ নেতার : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি। সেনাবাহিনী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, ইরানের সেনাবাহিনী শত্রুর দুর্বলতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছে। তাদের ড্রোন হামলা আমেরিকান ও জায়নিস্ট শক্তির ওপর বজ্রপাতের মতো আঘাত হানছে। ইরানের নৌবাহিনী শত্রুদের নতুন পরাজয়ের স্বাদ দিতে প্রস্তুত রয়েছে। মোজতবা খামেনি বর্তমান সংঘাতকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে থেকেছে।