‘৯ মাস বয়সের হাসসান আবদুল্লাহর প্রিয় খেলনা ছিল লাল ঘোড়া। প্লাস্টিকের লাল ঘোড়ায় দোল দিলেই ফিক করে হেসে দিত। সেই চাঁদমুখ কলিজার টুকরাকে নিজের বুকে করে কবরে শুইয়ে দিয়েছি। এক সন্তানকে হামে কেড়ে নিল, আরেকজনকে পানিতে।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন হাসসান আবদুল্লাহর বাবা হাফেজ মো. কামাল উদ্দিন। দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা মরিয়ম আক্তার। লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা হাফেজ মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সুনামগঞ্জ বাজারে নানার বাড়িতে পানিতে পড়ে মারা যায় দুই বছর বয়সি প্রথম সন্তান মো. আবদুল্লাহ। এরপর ২০২৫ সালে জন্ম নেয় দ্বিতীয় সন্তান হাসসান আবদুল্লাহ। এই সন্তানকে ঘিরে হাসি-আনন্দে ভরে ওঠে আমাদের সংসার। কিন্তু জন্ম থেকেই ছেলের হার্টে শনাক্ত হয় ছোট্ট ছিদ্র। ঢাকার হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চলছিল চিকিৎসা। গত ৭ এপ্রিল এ হাসপাতালে ছেলের অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর দুই দিন আগে হাসসানের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দেয়। আমরা দেরি না করে ছেলেকে নিয়ে হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটে আসি। হামের লক্ষণ থাকায় চিকিৎসকরা ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার্ড করেন। ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করলেও রোগীর চাপ অনেক বেশি থাকায় বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসি। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাসসানকে ভর্তি করি। ১৩ এপ্রিল ছেলের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পাগলের মতো ঢাকার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছি কিন্তু আমার হাম আক্রান্ত ছেলের জন্য একটা আইসিইউর ব্যবস্থা করতে পারিনি। চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারায় চোখের সামনে ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যেতে থাকে সন্তানের নিঃশ্বাস। ১৪ এপ্রিল বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে যখন মানুষ নতুন আশায় জীবন শুরু করছে, আমার কোলে তখন প্রিয় সন্তানের নিথর দেহ। আমাদের সব স্বপ্ন আশা শেষ হয়ে গেল। প্রথম সন্তানকে পানি কেড়ে নিল, আর দ্বিতীয় সন্তান হারিয়ে গেল হামের থাবায়।’
দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ২১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে ৩৫ শিশুর। বাকিদের হামে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে জেলা পর্যায় থেকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত হামে আক্রান্ত কিংবা হামের লক্ষণ নিয়ে আসা শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। অনেক শিশুর শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হলেও আইসিইউ না পেয়ে ওয়ার্ডেই চিকিৎসা চলছে। এমন অবস্থায় আইসিইউ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন অভিভাবকরা। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে দেখা যায়, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে ১৪টি আইসিইউ শয্যার সবকটি রোগীতে পরিপূর্ণ। কিছু শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও আইসিইউ পাচ্ছে না। সবারই হাতে ক্যানুলা, নাকে নল। শিশুদের চিৎকার-কান্না থামাতে পারছেন না মা-বাবা ও স্বজনরা। অভিভাবকদের কেউ শিশুকে সামলাচ্ছেন, কেউ নার্স-চিকিৎসকদের পেছনে যাচ্ছেন, কেউবা ওষুধ কিনতে হাসপাতালের বাইরে ছোটাছুটি করছেন। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হাসপাতালের কার্ডিয়াক, এনআইসিউ, কিডনি, সার্জিক্যালসহ সব মিলিয়ে ৭০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় জরুরি ভিত্তিতে আরও ১৪টি আইসিইউর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর তুলনায় এ সংখ্যা অপ্রতুল। প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫টি শিশুর আইসিইউর আবেদন জমা হয়। শয্যা ফাঁকা না থাকায় এসব রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় না। জানা যায়, হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচটি আইসিইউ রয়েছে, মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ৫৬টি আইসিইউ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৮ শিশুর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৪২ জন, নিশ্চিত হাম আক্রান্ত ৮৬ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪০৯ জন। এ সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ২৭৮ জনের। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৫২২ জন, সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে ১১ হাজার ৭৫১ জন।