দেশে এমন এক সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে, যখন সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। নতুন শিল্পে বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা চলছে। পুরোনো কারখানা বন্ধ করে ব্যয় সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন উদ্যোক্তারা। কলকারখানা বন্ধ হয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে দারিদ্র্য। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাড়ানো হলো জ্বালানি তেলের দাম। এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। ডিজেল-পেট্রোলের দাম বাড়ায় গণপরিবহন ভাড়া, পণ্য পরিবহন খরচ এবং কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে খরচ বাড়বে। দাম বাড়বে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সব পণ্যের। মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই বছরের মধ্যে তিনটি সরকারব্যবস্থার অভিজ্ঞতা নিয়েছে দেশের মানুষ। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আগের দুটি সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি আর ব্যর্থতার কারণে এমনিতেই অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকটেও দেশের মানুষ, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, শিল্প-সেবা ও কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন। এখন জ্বালানির দাম বাড়ায় তাদের টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রাক্তন বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা-এই তিনটি বিষয় আমলে নিয়ে বলা যায়, জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না। জ্বালানির দাম বাড়লে তা মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প-সেবা সব খাতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ থেমে গেলে অথবা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে সরকারের উচিত হবে দ্রুত জ্বালানির দাম সমন্বয় করে আবার কমিয়ে আনা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খুব বেশি দিন মানুষ বহন করতে পারবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে ১০০ ডলারে উঠে গেছে। জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ব্যয় যেমন বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভর্তুকিও। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সরকারকে চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এলএনজিতে নির্ধারিত ভর্তুকির অতিরিক্ত আরও প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ পরিস্থিতিতে শনিবার রাতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল এবং অকটেনের দাম ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও খাদ্যপণ্যে ব্যয় বাড়ায় মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। সঞ্চয় কমে যাবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হবে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সম্প্রতি প্রকাশিত সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বাড়লে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হবে। ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে যেতে পারে। পরিবহনমালিকরা জানান, জ্বালানির দাম বাড়ায় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ সামুদ্রিক পরিবহন জাহাজের ভাড়াও বাড়বে।
আজমেরি ট্রান্সপোর্টের পরিচালক রবিউল ইসলাম পরাগ বলেন, শনিবার রাতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর শুধু রাজধানী ঢাকায় প্রতি ট্রিপে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার তেল বেশি লাগছে। তিনি জানান, মালিকপক্ষ ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সাড়া মেলেনি। কাল (আজ) সোমবার পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত ভাড়ায় চললেও মঙ্গলবার থেকে নতুন ভাড়া নির্ধারণের জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনেও। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গৃহস্থ সারোয়ার জানান, ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে সেচ পাম্প বাবদ খরচ বাড়বে, যা ধানের উৎপাদন খরচ আরেক দফা বাড়িয়ে দেবে। কৃষির পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও কারখানা চালু রাখতে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় শিল্পের উৎপাদন খরচও বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কলকারখানায় জ্বালানি খরচ বাড়লে শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। যার প্রভাব বাজারে পড়ে।
দেশের নিট তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধাবস্থা চলছে, তাতে জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না। তবে একসঙ্গে এত বেশি না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাড়ানো যেত। দাম বাড়ানোর পরও জ্বালানি সরবরাহ যদি স্বাভাবিক না হয়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। সরকারের উচিত হবে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া।