জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহনে সরাসরি পড়তে শুরু করেছে। সরকারিভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের কোনো ঘোষণা না এলেও সুযোগ বুঝে অনেক পরিবহন চালক ও হেলপার ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। একই অবস্থা আন্তজেলা বাসেও। ভাড়া বাড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা, বিশেষ করে যারা প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দূরত্ব বেশি হলে এ অতিরিক্ত ভাড়া আরও বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে অনেক সময় চালক ও হেলপারদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। মিরপুর থেকে ফার্মগেটগামী এক বেসরকারি চাকরিজীবী ইকবাল হোসেন বলেন, আগে যেখানে ২০ টাকা ভাড়া দিতাম, এখন সেখানে ২৫ টাকা দিতে হচ্ছে। কোনো ধরনের নোটিস বা সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়াই এভাবে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সারওয়ার আলম বলেন, রামপুরা থেকে সায়েদাবাদ আগে ভাড়া ছিল ১৫ টাকা, এখন সেখানে ২৫ টাকা চাওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে বাসের হেল্পাররা অভদ্র আচরণ করছে। আমাদের বেতন তো বাড়েনি, কিন্তু প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে গেল। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বাড্ডা ও গুলিস্তান এলাকার যাত্রীরাও। একই অবস্থা আন্তজেলা বাস ভাড়ায়। সরকার বৃদ্ধি না করলেও মালিকরা বাড়িয়েছেন। ফকিরাপুলে হানিফ পরিবহনের কাউন্টারম্যান বাবুল মিয়া বলেন, তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভাড়ায়। ঢাকা-মৌলভীবাজার রুটে আগে ৫৭০ টাকা ভাড়া থাকলেও এখন তা বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ বৃদ্ধি কেবল একটি রুটে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য রুটেও ধীরে ধীরে ভাড়া সমন্বয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ শুধু বাসই নয়, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রাইড শেয়ারিং সেবাতেও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে যাত্রীদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। গত শনিবার রাত থেকে সরকার ঘোষিত নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে পরিবহন মালিক সমিতি। এ বিষয়ে গত রবিবার সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে ওই বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মালিক সমিতি সূত্র জানায়, ২০২২ সালের আগস্টে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.২০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর আর ভাড়া বাড়ানো হয়নি। তবে ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং বাসের যন্ত্রাংশের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ছয় মাস আগে ভাড়া ৪০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বিআরটিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গণপরিবহন পরিচালনার খরচ বেড়েছে। সেবার মান বাড়াতে হলে তাই যৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় লোকসান দিয়ে মালিকরা যাত্রী পরিবহন করতে পারবেন না। অন্যদিকে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে বাস, লঞ্চ ও অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি সরকারের কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব বা দরকষাকষি বাদ দিয়ে একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।