প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি সর্বদা অনুগত ছিল, আছে এবং থাকবে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আজও প্রকৃত অর্থেই জনমানুষের বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, যা দেশের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তারা বারবার প্রমাণ করেছে।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে দ্রুত সহায়তা প্রদান করে সশস্ত্র বাহিনী জনগণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যে ঐতিহাসিক বন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও অটুট রয়েছে এবং জাতীয় অগ্রযাত্রায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।’ গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চলমান জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬-এর অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগবিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ?উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী সব সময়ই বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় নিজেদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিতিশীল সময়ে, যখন সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন সশস্ত্র বাহিনী মাসের পর মাস দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করেছে।
সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, ব্যাংক, বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সার্বক্ষণিক উপস্থিতি বজায় রেখে তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জননিরাপত্তা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি আস্থা রেখে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কিছু অসাধু ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে সামরিক বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং সব ব্যর্থতার দায় সামরিক বাহিনীর ওপর চাপিয়ে সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কে ফাটল ধরাতে চেয়েছে। কিন্তু জনগণের আস্থা, সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারি এবং বেসামরিক প্রশাসনের একত্রিত সমন্বয়ের কারণে সেই অপচেষ্টা সফল হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের পারস্পরিক সহযোগিতা, আস্থা ও সমন্বয়ই রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করে তুলবে।’ অতীতের কিছু ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি সামরিক বাহিনীর বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে অপরাধে জড়ালে তার দায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর নয়। ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি সর্বদা অনুগত ছিল, আছে এবং থাকবে।’
অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান সফল ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের যেকোনো সংকটে সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।’
নৌবাহিনী প্রধান উপকূলীয় ও সমুদ্রসীমা রক্ষায় নৌবাহিনীর কার্যক্রম তুলে ধরেন। বিমানবাহিনী প্রধান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন বিমান সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার তাঁর বক্তব্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কাজ করছে।’
প্রতিরক্ষা সচিব জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীর সব কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুসংহত করতে তাদের অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।