দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ আবাসন খাত এখন গভীর সংকটে। উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, তারল্যসংকট এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে থমকে গেছে এ শিল্পের চাকা। এ অচলাবস্থা কাটাতে এবং আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের নীতিগত সমর্থনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এক সাক্ষাৎকারে আবাসন খাতের বর্তমান সংকট ও তা থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে কথা বলেছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. মো. আলী আফজাল।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশের আবাসন খাতের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. মো. আলী আফজাল : স্পষ্ট করে বলতে গেলে, দেশের আবাসন খাত এখন এক চরম দুঃসময় এবং স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে আবাসন খাতের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ডেভেলপাররা ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রি করতে পারছেন না। এই স্থবিরতা শুধু আমাদের ব্যবসায়ীদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : এই চরম সংকটের পেছনে মূল কারণ বা বড় প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?
ড. মো. আলী আফজাল : সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। সরকার ঢাকা শহরকে নিয়ে একটা পরিকল্পনা করেছিল। এ পরিকল্পনায় ভবনের উচ্চতা কমানো হয়েছে। ফলে জমির মালিকরা এখন ডেভেলপারদের কাছে জমি দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি- রড, সিমেন্ট, ইট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক তার, বালু এবং রঙের মতো সব ধরনের প্রধান কাঁচামালের দাম গত দুই বছরে ৩০% পর্যন্ত বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত ফিটিংস ও কাঁচামালের খরচও আকাশচুম্বী। এ ছাড়াও আছে ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের হার। একসময় গৃহঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট অর্থাৎ ৯ শতাংশের নিচে ছিল। বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সুদের হার ১৫% থেকে ১৭% পর্যন্ত ঠেকেছে। এর ফলে মাসিক কিস্তির পরিমাণ এত বেশি বেড়েছে যে, একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর পক্ষে তার বেতন দিয়ে সেই কিস্তি শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জমির উচ্চমূল্য : ঢাকা ও এর আশপাশের প্রধান শহরগুলোতে ফাঁকা জমির পরিমাণ সীমিত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমির কৃত্রিম সংকটের কারণে জমির দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়েছে, যা ফ্ল্যাটের ভিত্তিমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : এ স্থবিরতা কাটিয়ে আবাসন খাতে গতি ফেরাতে আপনাদের পরামর্শ কী?
ড. মো. আলী আফজাল : সরকার ঢাকা শহরের জন্য যে পরিকল্পনা করেছিল তা ছিল বৈষম্যমূলক। এ পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ঢাকাসহ দেশব্যাপী জোনিং করা উচিত। কোন এলাকায় আবাসন হবে, আবার কোন এলাকায় কৃষি, আবার জলাশয়সহ শিল্পকারখানা কোথায় থাকবে, তার জন্য জোনিং করে নির্ধারণ করতে হবে সরকারকে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা : আবাসন খাতকে একটি পরিকল্পিত কাঠামোতে আনতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমর্থন জরুরি। সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ : আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ (সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ শতাংশ) সুদে ৩০ বছর মেয়াদি একটি বিশেষ ‘আবাসন রি-ফাইন্যান্সিং ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি। একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর পক্ষে বর্তমান উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া অসম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি সহজ কিস্তির ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ মানুষ ভাড়ার টাকায় নিজের একটি ফ্ল্যাট কেনার সাহস পাবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আবাসন খাতের জন্য এ মুহূর্তে সরকারের ‘নীতিগত সহায়তা’ কেন জরুরি?
ড. মো. আলী আফজাল : আবাসন খাত কোনো বিচ্ছিন্ন শিল্প নয়। এর সঙ্গে রড, সিমেন্ট, ইট, বালুসহ প্রায় ২৬৯টি লিঙ্কেজ শিল্প জড়িত। এ খাতটি স্থবির হয়ে পড়লে পুরো দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগে। বর্তমানে আমরা যে সংকটে আছি, তা কেবল অর্থ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিনির্ধারণী সমর্থন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, আইন সংস্কার এবং করকাঠামো যৌক্তিক করার মতো নীতিগত সিদ্ধান্তই কেবল এ খাতকে আবার সচল করতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : এ নীতিগত সহায়তাগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে আবাসন শিল্পের ভবিষ্যৎ কী?
ড. মো. আলী আফজাল : সরকার যদি দ্রুত নীতিগত সহায়তা না দেয়, তবে বহু ছোট ও মাঝারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাবে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হবেন এবং ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই আমরা আশাবাদী, বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই আমাদের দাবিগুলো দ্রুত বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আবাসন খাতের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান কেমন?
ড. মো. আলী আফজাল : বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) আবাসন ও নির্মাণ খাতের অবদান ৮-৯%। তবে এর পরোক্ষ অবদান আরও অনেক বেশি। কারণ এ খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, ইট, ক্যাবল, গ্লাস, টাইলস ও রঙের মতো ২৬০টিরও বেশি উপ-খাত বা লিঙ্কেজ শিল্প জড়িত। আবাসন খাত গতি হারালে এই ২৬০টি শিল্পও স্থবির হয়ে পড়ে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তদুপরি এ খাতটি দেশের প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, যার বড় অংশই গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক। সব মিলিয়ে আবাসন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে ১৮ শতাংশ।