হাম ও হামের উপসর্গে দেশে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। আর দুই শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭৫ জনে। এর মধ্যে ৭৭ জনের হামে মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিন চালু বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও রোগীদের কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে যে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে তিনজন করে রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৬৪। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১১৫ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কেবিন চালু করতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করতে হবে। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল ও বিকালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রাউন্ড দিতে হবে। রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি অভিভাবক বা দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন না বলেও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভর্তি রোগীদের তথ্য প্রতিদিন এমআইএস সার্ভারে আপলোড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব রোধের ব্যর্থতা তদন্তে কেন কমিশন গঠন নয় : হামের প্রাদুর্ভাবের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা অনুসন্ধানে একটি অনুসন্ধান কমিশন কেন গঠন করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা তথা শিশুদের বাঁচানোর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সে বিষয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে আদেশে। জনস্বার্থে দায়ের করা পৃথক দুটি রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।
একটি রিটের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। পরে তিনি জানান, চলমান চিলড্রেন ট্র্যাজেডির ওপর তদন্তের জন্য কারা দায়ী, কেন রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলো, একটি ইনকোয়ারি কমিশন কেন গঠন করা হবে না, এ মর্মে রুল দিয়েছেন আদালত। স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
হামের টিকাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ তুলে গত রবিবার হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম। রিটে তদন্ত কমিটি গঠন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদের সব সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এর আগে ৬ এপ্রিল এ বিষয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়।
সেদিন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানান, সারা দেশে বিলুপ্তপ্রায় রোগ হাম আবারও মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক শ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং অসংখ্য শিশু ও সাধারণ মানুষ হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। হামের টিকা ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি তদন্ত কমিটি গঠন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানান। ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
গত ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন।
এ রিটে অন্তর্বর্তী আদেশের পাশাপাশি রুলও জারি করেছেন আদালত। এ রুলে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কেন গঠন করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাই কোর্ট। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও আইইডিসিআরের পরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।