ফেসবুকসহ বিভিন্ন সমাজমাধ্যম, অনিবন্ধিত ও ভুঁইফোঁড় অনলাইনে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা অপতথ্য ও ভুয়া খবর। এর সঙ্গে জড়িত দেশিবিদেশি চক্র। মূল উদ্দেশ্য দেশে এবং বিদেশে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গনেও সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী। ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কাল্পনিক ঘটনাকে হাতিয়ার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে তারা।
এসব বিষয় নিয়ে সেনাসদর, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক অফিসারদের পক্ষ থেকে একাধিকবার বক্তব্য ও বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বিভ্রান্ত না হতে জনসাধারণকে সতর্কও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করতে মাঝে-মধ্যেই এ ধরনের পরিকল্পিত তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ ও পেশাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিত অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন। এসব অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিরুদ্ধে দ্রুত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট (অবসরপ্রাপ্ত) সাইফুল্লাহ খান সাইফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ যখন জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট (সবার আগে বাংলাদেশ)’ নীতিতে পররাষ্ট্রনীতিকে আরও সুদৃঢ় করার পথে এগোচ্ছে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক সেই সময় ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন কার্যক্রম, যুদ্ধবিমান ক্রয় ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ সামনে আসার পর থেকেই একটি গোষ্ঠী বাহিনীকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিমানবাহিনী প্রধানের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন, বাহিনীর সঙ্গে চরমপন্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয় জড়ানোর চেষ্টা এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টাকে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলামকে নিয়েও কিছু অনলাইন পোর্টাল ও সমাজমাধ্যমে অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিমানবাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে ‘উগ্রপন্থার’ সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে কিছুদিন আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই সংবাদ প্রতিবেদনগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন জানতে চাইলে সাইফুল্লাহ খান বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়ে তথ্য ও খবর দিয়ে থাকে আইএসপিআর। যেহেতু এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য আসেনি, তাই বিষয়টাকে গুজব বলে ধরে নেওয়া যায়।
অবসরপ্রাপ্ত এই লেফটেন্যান্ট বলেন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এ দেশের মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও গর্বের প্রতীক। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা থেকে শুরু করে দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতীয় সংকট কিংবা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সশস্ত্র বাহিনী সব সময় সাহস, শৃঙ্খলা ও পেশাদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের মতো জাতীয় পরিস্থিতিতে জনগণের পাশে থেকে দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা পালন করে সশস্ত্র বাহিনী আবারও প্রমাণ করেছে যে, তারা কেবল একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয় বরং জাতির আস্থা ও স্থিতিশীলতার শেষ ভরসা।
সশস্ত্র বাহিনীকে টার্গেট করে এ ধরনের গুজব ছড়ানো ও অপপ্রচার নতুন কিছু নয় বলে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সশস্ত্র বাহিনী ও সেনাপ্রধানকে নিয়ে একাধিকবার অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর পক্ষ থেকে একাধিকবার বিবৃতি দিতে হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ইদানীং পরিলক্ষিত হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানকে জড়িয়ে নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। জনসাধারণকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকতে বিনীতভাবে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। একই ইস্যু উঠে আসে সেনাসদর আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনেও। এ নিয়ে একাধিকবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে সেনাসদরকে। এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি কিছু স্বার্থান্বেস্বী মহল সেনাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মিথ্যা-বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাই আমি দেশবাসীকে নিশ্চিত করতে চাই-সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য সেনাবাহিনী প্রধান এবং সেনাবাহিনীর সিনিয়র লিডারশিপের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত রয়েছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যরা আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধ আরও বেশি সুদৃঢ়। তাই সবাইকে আমরা বলব-চলুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারকে পেছনে ফেলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা সবাই সামনের দিকে এগিয়ে যাই। যেই দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেই দায়িত্ব দেওয়া হবে-সেনাবাহিনী তা যথাযথভাবে পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।