দেশে নীরবে কিন্তু দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে হৃদরোগ। একসময় যে রোগটি বয়সের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত বলে মনে করা হতো, এখন তা অল্প বয়সীদের মাঝেও আশঙ্কাজনকভাবে দেখা যাচ্ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব সব মিলিয়ে হৃদরোগ এখন দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। হৃদরোগ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা। শহরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক জীবন, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ মানুষের হৃদযন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনিযুক্ত খাবারের অভ্যাস। ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এখন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে গেছে, যা ধীরে ধীরে রক্তনালি সংকুচিত করে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে।
ধূমপান হৃদরোগ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ। ধূমপান সরাসরি হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদরোগের শঙ্কা আরও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এসব সমস্যার কথা জানলেও নিয়মিত চিকিৎসা বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনে আগ্রহ দেখান না, যা পরবর্তীতে বড় জটিলতায় রূপ নেয়।
হৃদরোগের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধুমপান বর্জনের মাধ্যমে হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা সম্ভব। প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটা বা হালকা শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হৃদরোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, ব্যস্ততা ও অসচেতনতার কারণে এসব অভ্যাস গড়ে ওঠে না। হৃদরোগ চিকিৎসায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে মিলছে অত্যাধুনিক সেবা। এখন সচেতনতা অনেকটা বেড়েছে। বুকে ব্যথা হলে অনেকেই চলে আসেন হাসপাতালে। এতে হাসপাতালে রোগীর চাপও বেড়েছে কয়েকগুণ। হৃদরোগ বৃদ্ধির এই চাপে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কার্ডিয়াক সার্জনের ঘাটতি একটি সমস্যা। রোগীর তুলনায় দেশে কার্ডিয়াক সার্জনের সংখ্যা অনেক কম। আরও কার্ডিয়াক সার্জনের প্রয়োজন। এজন্য কার্ডিয়াক সার্জারিকে সুপারস্পেশালাইজড সার্ভিস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এজন্য আলাদা বেতন কাঠামো করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে সকাল-বিকাল দুবেলা সার্জারি করতে পারলে হৃদরোগী দ্রুত সেবা পাবে। আমরা এ বিষয়ে সরকারকে বেশকিছু দিন আগেই প্রস্তাব দিয়েছি। সুপারস্পেশালাইজড সার্ভিস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়তো নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকরা কার্ডিয়াক সার্জন হতে আগ্রহ হারাবে।
হৃদরোগ মোকাবিলায় কেবল চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার করা এবং জেলা পর্যায়ে হৃদরোগ চিকিৎসা ও সার্জারির সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে কার্ডিওসার্জন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। সামগ্রিকভাবে হৃদরোগ এখন শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই রোগ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও জনবল উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে এই নীরব সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিয়াক সার্জারি, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।