লুৎফর রহমান। বয়স ৮০। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অভাব-অনটন সঙ্গী করে তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে। প্রতিদিন সাইকেলে চেপে কিংবা হেঁটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়ান। হাতে থাকে খাতা-কলম। ডেকে-খুঁজে আগ্রহী শিশুদের পড়ান। বিনিময়ে নেন মাত্র এক টাকা, কেউ না দিলে তাতেও তার কোনো আক্ষেপ নেই
গাইবান্ধার সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া এলাকার কিশামত ফলিয়া গ্রামের এক প্রবীণ মানুষ, নাম লুৎফর রহমান (৮০)। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অভাব-অনটনকে সঙ্গী করে তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে। প্রতিদিন সাইকেলে চেপে কিংবা হেঁটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়ান, হাতে থাকে খাতা-কলম। বিনিময়ে নেন মাত্র এক টাকা, কেউ না দিলে তাতেও কিছু আসে যায় না। শিক্ষা তাঁর কাছে পেশা নয়, এক ধরনের নেশা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন লুৎফর রহমান। কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কারণে তা পূরণ হয়নি। সেই না-পাওয়ার কষ্টই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, ম্যাট্রিকের পর অর্থাভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারিনি। তখনই ঠিক করি, আমার মতো আর কোনো শিশু যেন টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ না করে। শুরুতে বিনা পয়সায় পড়ানো শুরু করেন। পরে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই প্রতিদিন এক টাকা করে দিতে চায়। সেই থেকেই তাঁর নাম হয় ‘এক টাকার মাস্টার’। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনে হারান নিজের ভিটেমাটি। ওয়াপদা বাঁধের পাশে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। আজও সেই টিনের ঘরেই থাকেন স্ত্রী লতিফুন বেগম, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে। সংসারে কষ্ট আছে, কিন্তু তা কখনো থামাতে পারেনি তাঁর শিক্ষাদান। তিনি বলেন, ‘শিশুদের পড়াতে গেলেই অভাবের কথা ভুলে যাই।’ প্রতিদিন সকালে পুরোনো সাইকেল নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, চন্দিয়া, কঞ্চিপাড়া, মধ্যপাড়া, পূর্বপাড়াসহ আশপাশের সাত-আটটি গ্রামের ৩০ থেকে ৪০ জন শিশুকে পড়ান। কখনো গাছের নিচে, কখনো রাস্তার পাশে, কখনো বাঁধের ওপর বসেই চলে ক্লাস। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়শা আক্তার জানায়, পড়তে না এলে স্যার আমাদের খোঁজ নেন। আমরা না এলে নিজেই বাড়ি গিয়ে ডাকেন। অভিভাবক মর্জিনা বেগম বলেন, লুৎফর স্যার নামমাত্র টাকায় পড়ান। তাঁর ছাত্ররা এখন ডাক্তার, পুলিশ, বিসিএস কর্মকর্তা। স্থানীয় এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সম্পা খাতুন বলেন, ‘তিনি আমাকেও পড়িয়েছেন। স্যার আমাকে খুব আদর করতেন। গ্রামের এক শুভাকাক্সক্ষী বলেন, ‘তিনি অভিমানী মানুষ। পেটে ক্ষুধা থাকলেও বলেন না। কেউ টাকা দিলে নিতেও চান না।’ গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাশ হিমুন বলেন, লুৎফর রহমান শুধু শিক্ষক নন, সমাজের আলোকবর্তিকা।’ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মাত্র এক টাকায় শিক্ষা বিলিয়ে যাওয়া এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটি মানবিক দায়বদ্ধতা।