বাড়িটির নাম ‘বই বাড়ি’। পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে ওঠা এই বাড়িতে এখন শিশু-কিশোরদের আনাগোনা। যেন বইয়ের ঘ্রাণে ছুটে আসছে তারা। এর পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি মোক্তারুল ইসলাম মুক্তার। স্থানীয় হাইস্কুলের এই শিক্ষক তাঁর নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন এক দৃষ্টিনন্দন পাঠাগার। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে নানা ধরনের বই। সে বই পড়তে ছুটে আসছে গ্রামের শত শত শিশু-কিশোর। বইয়ের গল্পে, বইয়ের আড্ডায় ‘বই বাড়ি’ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে জ্ঞানের বহ্নিশিখা।
শহর থেকে অনেক দূর। গ্রামীণ আঁকাবাঁকা মেঠো পথ পেরিয়ে, বাঁশ ঝাড়ের নিচে, রাস্তার পাশে একটি বাড়ি। বাড়ির ভিতরের আঙিনাজুড়ে নানা ধরনের ফুল আর ক্যাকটাসের বিচিত্র ক্যানভাস। বারান্দায় ঝুলে আছে ফুলের টব। তার পাশে টিনের ছাপড়া দিয়ে বানানো পড়ার ঘর। আঙিনা পেরিয়ে অন্য ঘরের আলামারিতে তাকে তাকে সাজানো রয়েছে অনেক বই। এই বাড়িটি এখন পরিচিত ‘বই বাড়ি’ নামে। জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার দেবনগর গ্রামে মোক্তারুল ইসলাম তার নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন এই উন্মুক্ত লাইব্রেরি। নাম দিয়েছেন বই বাড়ি। দেবনগর গ্রামসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম থেকে বই পড়ার জন্য ছুটে আসছে বই পড়ুয়ারা। লাইব্রেরির রেজিস্টার খাতায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে বই নিয়ে যায় কিশোর-কিশোরীরা। পড়া শেষ হলে লাইব্রেরিতে আবার ফিরিয়ে দেয় এসব বই। পড়া শেষ হওয়া বইগুলো নিয়ে প্রতি মাসে বসে ‘বই আড্ডা’। বই আড্ডায় গান, গল্প, বিনোদন আর ভোজনের আয়োজন থাকে। সমাজের বিশিষ্টজন, কবি, শিল্পী-সাহিত্যিকরাও এই আড্ডায় যোগ দেন। শিশু-কিশোরদের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। এভাবেই ‘বই বাড়ি’ থেকে জ্ঞানের বহ্নিশিখা ছড়িয়ে পড়ছে সবার মাঝে। কাজল দিঘি টুনির হাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক মোক্তারুল ইসলাম মুক্তার জানান, তার বই পড়ার আগ্রহ থেকেই গড়ে তোলেন এই লাইব্রেরি। বই বাড়ির যাত্রা শুরু হয় মাত্র কয়েক বছর আগে। এরই মধ্যে জেলাজুড়ে সাড়া ফেলেছে এই উদ্যোগ।
মুক্তারুল ইসলাম মুক্তার বলেন, ‘বিচিত্র সব বই আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। নিজের এই চর্চাকে প্রান্তিক শিশু-কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। শুধু বই পড়া নয় শিশু-কিশোরদের সঙ্গে সমাজের জ্ঞান, গুণীজনদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য তাদের এ পাঠশালায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।’ মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এহতেশামুল হক বলেন, ‘বই বাড়ির বই আড্ডায় আমি গিয়েছি। বইয়ের রাজ্যে বইয়ের মধ্যে যে মানুষের অন্তর্চক্ষু খুলে যায় এটির একটি প্রাণবন্ত উপস্থাপনা এই বই আড্ডা। আড্ডায় উপস্থিত শিশুকিশোর তরুণদের দেখে আমরা তা বুঝতে পারি। বই বাড়ি অবশ্যই একটি সমৃদ্ধ উদ্যোগ।’