উৎপাদন আধুনিকীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়াচ্ছেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই শিল্প ধীরে হলেও এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়তা ও রোবটিক্স থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে পোশাকশিল্প। এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় হাতে-কলমে কাজের পরিমাণ কমে আসছে এবং দক্ষতা বাড়ছে। শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর ক্রমবর্ধমান কমপ্লায়েন্স চাহিদা, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর কঠোর টেকসই মানদণ্ড এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থেকেই এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে।
এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে দেশের সবচেয়ে বড় গার্মেন্টস প্রযুক্তি প্রদর্শনী গার্মেন্ট টেকনোলজি বাংলাদেশ (জিটিবি) ২০২৬-এ। রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় এই প্রদর্শনীর ফাঁকে উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানান। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, তৈরি পোশাক কারখানাগুলো ক্রমেই বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের টেকসই লক্ষ্যের সঙ্গে উৎপাদন প্রক্রিয়া সামঞ্জস্য করছে।
তিনি বলেন, এর ফলে অনেক কারখানা নির্গমন কমানো, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রোবোটিক্স ও আরএফআইডি সিস্টেমসহ জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে। নিজের প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সম্প্রতি তার কোম্পানির দুটি কারখানা ঢাকার উপকণ্ঠ ধামরাইয়ে অবস্থিত তাদের শিল্প পার্কে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসব কারখানা লিড সনদপ্রাপ্ত ভবনে অবস্থিত এবং সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে ও কার্বন নিঃসরণ কমে।
প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে মজুত ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আসছে। আর-প্যাক (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ কামিস বলেন, ২০২৪ সালে তার প্রতিষ্ঠান স্ক্যানিংভিত্তিক ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা সমাধান চালু করেছে, যা তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের চালান-সংক্রান্ত ভুল কমাতে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়াতে সহায়তা করছে। এ পর্যন্ত ফকির গ্রুপ, পাইওনিয়ার গ্রুপ ও পালমাল গ্রুপসহ ৩৪টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি আরও জানান, খেলাধুলার দলের ফ্যান টি-শার্টে এমবেড করা আরএফআইডি চিপ ব্যবহার করে একটি নতুন অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি ভক্তদের সঙ্গে দলের ভিডিও ও বিভিন্ন কার্যক্রম শেয়ার করতে পারছে, যা গ্রাহক সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের জন্য বিপুল পরিমাণ ফ্যান অ্যাপারেল উৎপাদনের কারণে বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির বড় সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও ভিয়েতনাম ও চীন ইতোমধ্যেই এ ধরনের সমাধান গ্রহণ করেছে। অটোম্যাক টেকনোলজি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো. শফিকুর রহমান বলেন, তার প্রতিষ্ঠান উন্নত স্বয়ংক্রিয় কাপড় কাটার মেশিন বাজারে এনেছে। সর্বশেষ মডেলগুলোতে বিল্ট-ইন রিপিট কাটিং সুবিধা থাকায় প্রসেসিং সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। টেক্সটাইল পর্যায়েও রোবটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে, যদিও এসব প্রযুক্তিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি। এনভয় টেক্সটাইলসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বের প্রথম লিড-সনদপ্রাপ্ত ডেনিম মিল হিসেবে এনভয় দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও পণ্যের মান উন্নয়নে রোবোটিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন লাইনের স্বচ্ছতা আরও বাড়াতে আমরা এখন এআই-চালিত প্রযুক্তি আমদানির বিষয়ে আলোচনা করছি। একইভাবে, ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে শামিম এহসান জানান, তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ লাখ ডলার ব্যয়ে একটি এআই-সক্ষম স্বয়ংক্রিয় কাপড় কাটার মেশিন আমদানি করছে, যা কাপড়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং অপচয় কমাবে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে প্রায় ৫০ হাজার ডলার মূল্যের একটি এআই-চালিত কাপড় পরিদর্শন মেশিন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে এই মেশিন দ্রুত ও নির্ভুলভাবে গুণগত পরীক্ষা সম্পন্ন করবে, ফলে হাতেকলমে পরিদর্শনের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।