চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ছয় মাসে কৃষিঋণ বিতরণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বড় অগ্রগতি। একই সঙ্গে ঋণ আদায়েও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, যা ব্যাংকিং খাতে কৃষিঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কৃষিঋণ আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। ফলে বকেয়া কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা, যা এক বছরে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণ বিতরণ ও আদায়- দুই সূচকেই একযোগে প্রবৃদ্ধি হওয়ায় কৃষি অর্থায়নে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিঋণ বিতরণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, চাষাবাদের আওতা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকদের বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষি ও পল্লি ঋণে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোও মাঠপর্যায়ে ঋণ বিতরণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি- উভয় শ্রেণির ব্যাংককে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হচ্ছে।
তবে কৃষিঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ালেই হবে না; অর্থের সঠিক ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে তদারকি, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ঋণের অপব্যবহার ও ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকেই যাবে। এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়- উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। তাঁর মতে, সময়মতো ও কার্যকর ঋণপ্রবাহ কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ড. রিয়াজ আরও বলেন, সহজ শর্তে ঋণ পেলে কৃষকরা উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষিযন্ত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন, যা ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করে। একই সঙ্গে ঋণ আদায়ের হার বৃদ্ধি পাওয়া প্রমাণ করে যে, কৃষকরা ঋণ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল আচরণ করছেন, যা ব্যাংক ও কৃষক উভয়ের জন্যই একটি টেকসই ঋণচক্র গড়ে তুলছে। তবে তিনি এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের অন্তর্ভুক্তিতে। এই শ্রেণির কৃষকরা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সুদের হার বেশি এবং ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
সুতরাং কৃষিঋণ খাতে বর্তমান ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে রূপ দিতে হলে নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকগুলোর উচিত ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, পাশাপাশি ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও কারিগরি সহায়তা জোরদার করা। তবেই কৃষিঋণ সত্যিকার অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।