বাংলাদেশের বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল সলিউশন ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থাসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন আকিজ বিল্ডিং সলিউশনস লিমিটেডের ক্লাস্টার সিইও আসাদুল হক সুফিয়ানী
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল সলিউশন ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আসাদুল হক সুফিয়ানী : দেশের বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল খাত একটা ক্রান্তিলগ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে আমাদের আশা যেসব অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো বন্ধ আছে, স্থগিত আছে বা ধীরগতিতে যাচ্ছে নতুন সরকার সেগুলো পুনরায় পুরোদমে চালু করবে। এগুলো পুনরায় যদি চালু হয়, তাহলে আমাদের উৎপাদনক্ষমতা বাড়বে। সেক্ষেত্রে আমাদের ব্যবসায় গতি ফিরে আসবে। করোনার পর থেকেই মূলত আমাদের এ খাতে সমস্যা শুরু হয়। পরে ডলার সংকট ও উচ্চ দামের কারণে ব্যবসার বড় ক্ষতি হয়েছে। এর পরও ভেবেছিলাম আমরা এগিয়ে যেতে পারব। কিন্তু ডলারের দাম স্থিতিশীল হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল খাত ধীরগতি থেকে বের হতে পারেনি। এ খাতের অবস্থা খুব ভালো না। আমরা সরকারের কাছে আশা করব কাঁচামালের কর কমানো, নৌপথে মালামাল পরিবহনের যে রেট রয়েছে তা আরও সাশ্রয়ী করা। এ ক্ষেত্রে সরকার আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করলে আমরা মনে করি যেসব সমস্যা আছে সেখান থেকে বের হতে পারব এবং বাংলাদেশের এ খাতের কোম্পানিগুলো দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। এটা একটা বাল্ক ইন্ডাস্ট্রি। এ খাতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ জায়গাটাতে সরকারকে সচেতন হওয়ার জন্য অনুরোধ করব আমরা যেন এ ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রাখতে পারি এবং ভবিষ্যতে দেশ গড়ার ক্ষেত্রে এ খাতের কোম্পানিগুলো আরও অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করায় বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ও অবকাঠামো খাতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?
আসাদুল হক সুফিয়ানী : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশ একটি জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বৈদেশিক বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যাশিত হারে ব্যবসায়িক অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম সরকারের নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে মন্থর হয়ে পড়ায় আমাদের কাজের পরিধিও সংকুচিত ছিল। তবে এখন আশার বিষয় হলো- বাংলাদেশে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং আমরা ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। গত দুই বছরে যে অবকাঠামো প্রকল্পগুলো অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় আটকে ছিল, সেগুলো পুনরায় চালু হবে বলে আমরা আশাবাদী।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : নতুন সরকারের জন্য অবকাঠামো খাতে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? একই সঙ্গে এ খাতে কী কী নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?
আসাদুল হক সুফিয়ানী : আমার উপলব্ধি অনুযায়ী, নতুন সরকারের জন্য আসন্ন বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধীরগতির অর্থনীতির কারণে অনেক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প শুরু বা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রমে একটি স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এদিকে সাম্প্রতিক পট পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কাজের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে অথবা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটি নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রকল্প বরাদ্দ দিলেও এসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে ও মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়। তাদের সক্ষমতা পুনর্গঠন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো যোগ্য ও অভিজ্ঞ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা। অতীতে যারা দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো খাতে সফলভাবে কাজ করেছে, তাদের অনেকে এখন এই খাতে সক্রিয় নেই। নতুন উদ্যোক্তা ও নতুন কোম্পানিকে যুক্ত করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে একই সঙ্গে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মূলধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
আমরা মনে করি, গত ২৫-৪০ বছরে গড়ে ওঠা বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা, নীতিগত সহায়তা ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে সরকারই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান সক্রিয় হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, সরকার কর ও ভ্যাট পাবে এবং অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল হবে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় অতিক্রম করলেও অবকাঠামো উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা এখনো রয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, সেগুলো পুনরায় চালু করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করা নতুন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : গুণগত মানসম্পন্ন, টেকসই এবং সাশ্রয়ী অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে গ্রাহক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন কোন বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিত?
আসাদুল হক সুফিয়ানী : যেহেতু এটি একটি টেকনিক্যাল পণ্য, তাই এর সঙ্গে মানুষের আবেগ গভীরভাবে জড়িত। একজন মানুষ তার বহু বছরের সঞ্চয় দিয়ে নিজের বাড়ি, ঘর বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করেন। অন্যদিকে সরকার যখন সেতু, কালভার্ট বা বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করে, তখন লাখো মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সেই নির্মাণের মানের ওপর নির্ভর করে। তাই টেকসই, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য গ্রাহকদের সচেতনভাবে কিছু বিষয় বিবেচনা করে পণ্য নির্বাচন করা উচিত। যেমন- প্রথমত, কোম্পানির অভিজ্ঞতা ও সুনাম। কত বছর ধরে তারা বাজারে রয়েছে এবং প্রকৌশলী বা পেশাজীবী মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কেমন। দ্বিতীয়ত, তাদের পণ্য দিয়ে কত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত হওয়া মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তৃতীয়ত, সময়মতো সরবরাহ দেওয়ার সক্ষমতা। নির্মাণকাজে সময় অত্যন্ত মূল্যবান, তাই নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া জরুরি। চতুর্থত, বিক্রয়োত্তর সেবা শুধু পণ্য বিক্রি করাই নয়, বরং যেসব কোম্পানির নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং টিম রয়েছে এবং প্রয়োজনে গ্রাহককে সহায়তা দিতে পারে তাদের প্রতি আস্থা রাখা যায়। নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও সাহসিকতার সঙ্গে যারা কাজ করে অর্থাৎ মানের বিষয়ে আপস করে না- এমন প্রতিষ্ঠানকেই বেছে নেওয়া উচিত। সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করলে গুণগত মান নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন থাকে না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : উন্নতমানের ও নির্ভরযোগ্য বিল্ডিং সলিউশন নিশ্চিত করতে আকিজ বিল্ডিং সলিউশনের পক্ষ থেকে কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে?
আসাদুল হক সুফিয়ানী : আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আকিজ রিসোর্স গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আকিজ সিমেন্ট, আকিজ ইস্পাত, আকিজ আস্ফাল্ট এবং আকিজ রেডিমিক্স গত দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের নির্মাণ খাতে গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্য সেবার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করেছে। শুধু বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস নয়, আমরা যেসব খাতে কাজ করছি প্রতিটি ক্ষেত্রেই মান, সেবা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং সে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছি। বিশেষ করে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল সলিউশনের ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থাপনা নির্মাণের জন্য যা যা প্রয়োজন সেগুলোর সমন্বিত সমাধান আমরা দিতে সক্ষম। এই বিল্ডিং সলিউশনের মাধ্যমে আমরা সরকারি ও বেসরকারি ছোট থেকে বড় সব ধরনের প্রকল্পে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে সেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সারা দেশে আমাদের শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউটর নেটওয়ার্ক, করপোরেট সেলস টিম এবং অভিজ্ঞ টেকনিক্যাল সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়াররা যে কোনো সময় গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী সমাধান দিতে প্রস্তুত। আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা যদি আমাদের সঙ্গে থাকেন, তাহলে এক ছাতার নিচে সমন্বিত, মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য নির্মাণ সমাধান পাবেন।