বিশাল বাজেটের চাপে নতুন সরকার। তাই করকাঠামোতে আনা হচ্ছে নানা ধরনের পরিবর্তন। নিত্যপণ্যের ঋণপত্রের কমিশনের উৎসে কর দ্বিগুণ করার বিষয় পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়লেও করহারে পরিবর্তন আনা হতে পারে। চালু হতে পারে সম্পদ কর। অগ্রিম আয়করের আওতায় আসতে পারে মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শূন্য রিটার্ন ব্যবস্থা থেকেও সরে আসার চিন্তা করছে সরকার। রপ্তানিকারকদের প্রণোদনার ওপর কর আরোপ হতে পারে ২০ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক চাপের এই সময়ে করের বোঝা চাপালে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
বাজেট নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। মূলত শুল্কায়ন নিয়েই যত জিজ্ঞাসা। হিসাব মেলাতে ব্যস্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের মধ্যে চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে দফায় দফায় সিদ্ধান্ত, পরিবর্তন হচ্ছে অনেক কিছু। গত কয়েক বছর ধরে এই জায়গায় রয়েছে ব্যক্তি করমুক্ত আয়ের সীমা। ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ে কোনো কর নেই। পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ে ১০ শতাংশ, ৪ লাখ টাকা আয়ে ১৫ শতাংশ, ৫ লাখ টাকা আয়ে ২০ শতাংশ, ২০ লাখ টাকা আয়ে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হচ্ছে। তবে পরিবর্তিত এই সময়ে কিছুটা নমনীয় হচ্ছে সরকার। আয়ের স্লাব ও করহারে আনা হতে পারে পরিবর্তন। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের ওপর ভ্যাট মওকুফ সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে শুল্ক কর বাড়তে পারে আমদানি করা ল্যাপটপ, প্রিন্টার, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, টোনার ও অন্যান্য প্রযুক্তি সামগ্রীর ওপর। ছাড় দেওয়া হতে পারে পুঁজিবাজারে লভ্যাংশ বিতরণে দেওয়া ১০ শতাংশ উৎসে কর। সারচার্জ ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সম্পদ কর আরোপের চিন্তা করছে সরকার। নতুন নিয়মে সম্পদের মূল্যনির্ধারণ হবে বাজারভিত্তিক ও মৌজা হিসেবে। ৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে সম্পদ থাকলে দিতে হতে পারে সম্পদ মূল্যের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ সম্পদ কর। ভ্যাট খাতে স্বচ্ছতার পাশাপাশি আদায় নিশ্চিত করতে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করতে চায় এনবিআর। বিপুলসংখ্যক খুচরা ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে আনা হবে ভ্যাটের আওতায়। সহজ করা হবে আয়কর রিটার্ন জমার পদ্ধতি। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন করে সম্পদ কর আরোপ পর্যালোচনা ও চিন্তার বিষয়। কারণ অনেক মানুষ এতে কষ্টের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। এই বিষয়টি যতটা আকর্ষণীয় মনে হয় ততটা সহজ না। সিগারেট ও তামাকপণ্যে কর আরোপ নিয়ে চারদিকে বেশ আলোচনা। সিগারেটে নতুন করে কোনো কর বসাতে চায় না এনবিআর। তবে শলাকা প্রতি দাম বাড়ানো হতে পারে। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের মতোই আগামী অর্থবছর থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অনলাইন রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করতে চায় সরকার। স্টেডিয়ামে খেলা দেখা, মঞ্চনাটক ও গানের অনুষ্ঠান দেখতে দিতে হতে পারে কর।
নাসির উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ভয়টা এখানেই, শুধু আরোপ করলেই হবে না। আদায়ও করতে হবে। বরং টাকা পয়সা যেভাবে বাইরে চলে যাচ্ছে এগুলো বন্ধ করতে হবে। এসব টাকা দেশে থাকলে বিনিয়োগ হতো, কর দিত। আবগারি আমানতের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার চিন্তা করছে সরকার। ঋণের ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। অগ্রিম আয়করের আওতায় আসতে পারে ১১০ সিসির বেশি মোটরসাইকেল। এক্ষেত্রে ১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত ২ হাজার টাকা, ১২৬ সিসি থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা, ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপ হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলেন, ভ্যাটের যেসব জায়গায় আমাদের লোকসান হচ্ছে সেই জায়গাটা অটোমেশনের মাধ্যমে আদায় বাড়ানো ও করহার যৌক্তিককরণের জায়গায় নজর দিতে হবে।
ঢালাও কর অব্যহিত সুবিধা বাতিল করতে চায় এনবিআর। আয়কর থেকে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সুবিধা নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দেওয়া হচ্ছে বেশি করছাড়। সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, সেটা মেটাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে করকাঠামোতে আনা হচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন। তবে জনগণের কাঁধে করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বৃদ্ধি করতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।