এক সময় ভারতের সবচেয়ে বিলাসবহুল বিমান পরিষেবাগুলোর একটি ছিল কিংফিশার এয়ারলাইন্স। বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন ছিলো, ফ্লাই দ্য গুড টাইমস। তবে কিংফিশারেরই আর সুসময় বেশিদিন টেকেনি।
সেলিব্রিটি লঞ্চ, শ্যাম্পেন পরিবেশন এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সের মতো প্রিমিয়াম পরিষেবায় ভর করে দ্রুত আলোচনায় উঠে আসে এই সংস্থা। আর এর পেছনে ছিলেন ব্যবসায়ী বিজয় মাল্য। দেশে-বিদেশে পরিচিত ছিলেন কিং অফ গুড টাইমস নামে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই স্বপ্নের এয়ারলাইন্স ভেঙে পড়ে বিশাল ঋণের বোঝায়।
২০০৫ সালের মে মাসে উড়ান শুরু করে কিংফিশার এয়ারলাইন্স। যাত্রীদের জন্য বিলাসবহুল পরিষেবা, ভালো খাবার, বিনোদনের ব্যবস্থা; সবকিছুই ছিল আন্তর্জাতিক মানের। বাজারে নতুন হওয়া সত্ত্বেও কর্পোরেট যাত্রী ও সেলিব্রেটিদের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে এই এয়ারলাইন্স।
কিন্তু সমস্যা ছিল ব্যবসায়িক মডেলে। বাজারে যেখানে অধিকাংশ যাত্রী কম খরচের টিকেট খুঁজছিল, সেখানে কিংফিশার নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল লাক্সারি এয়ারলাইন্স হিসেবে। ভারতে এই মডেল টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০০৭ সালে মাল্য একটি বড় পদক্ষেপ নেন, বাজেট এয়ারলাইন্স এয়ার ডেকান অধিগ্রহণ করেন তিনি। মূলত কম খরচের যাত্রীদের বগলদাবা করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিলাসবহুল ও বাজেট, দুটি একেবারে ভিন্ন মডেলকে একত্রিত করার চেষ্টা তৈরি করে বিভ্রান্তি।
পরিচালনা খরচ বাড়তে থাকে, সংস্থার পরিচিতি হারাতে থাকে। প্রত্যাশিত লাভ তো হলো না বরং ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে দ্রুত।
২০১১ সালের মধ্যে কিংফিশারের ঋণ ৯ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যায়। বেতন বন্ধ হয়ে যায় হাজার হাজার কর্মীর। বহু বিমানকারী সংস্থা, তেল কোম্পানি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, সবাই পাওনা টাকা দাবি করতে থাকে। হঠাৎ হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল, গ্রাউন্ডিং; পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে।
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে, ভারতের বেসামরিক বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডি.জি.সিএ. কিংফিশারের ফ্লাইং লাইসেন্স স্থগিত করে। বছরের শেষেই লাইসেন্স পুরোপুরি বাতিল হয়।
ট্যাক্স বকেয়া থেকে শুরু করে ব্যাংক ঋণ; একের পর এক মামলার মুখোমুখি হন বিজয় মাল্য। সেবা কর পরিশোধ না করার অভিযোগে তার সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। পরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা তদন্তে নামে। ব্যাংকগুলোর তরফ থেকে ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা শুরু হয়।
২০১৬ সালের মার্চে মাল্য দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। ব্যাংকগুলোর হিসাব অনুযায়ী সুদ-জরিমানা মিলিয়ে মোট পাওনা দাঁড়ায় ১৭ হাজার কোটিরও বেশি। এর মধ্যে পুনরুদ্ধার হয়েছে কিছু অর্থ, কিন্তু বাকি রয়েছে প্রায় ৭,০০০ কোটি রুপি। ভারত সরকার মাল্যের প্রত্যর্পণের জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছে।
২০২৫ সালে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মাল্য দাবি করেন, তিনি অপরাধী নন এবং ব্যাংকগুলিকে পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার বক্তব্য, খারাপ সময় এবং খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। তবে তিনি পুরো দায় নিজের বলে স্বীকার করেননি।
কিংফিশারের পতন আজ ভারতের কর্পোরেট ইতিহাসে সতর্কবার্তার প্রতীক। বিলাসিতা, প্রচার আর ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং, কোনটাই ব্যবসার মূল ভিত্তি নয়। পরিসংখ্যান আর বাস্তব আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া, গুড টাইমস যত দ্রুত আসে, তত দ্রুতই মিলিয়ে যায়।
সূত্র: এনডিটিভি
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল