ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের চাপ সামলাতে না পেরে একের পর এক ভোটকর্মীর মৃত্যু এবং আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের মতো রাজ্যগুলোতে এই পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে।
অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘অমানবিক’ কাজের চাপের কারণেই অনেক বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। গত মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভারতজুড়ে অন্তত ৩৩ জন নির্বাচনী কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে অনেকেই প্রচণ্ড মানসিক চাপের কথা উল্লেখ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউয়ের বাসিন্দা শিক্ষক বিজয় কুমার বর্মা সম্প্রতি মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মারা যান। তার পরিবারের অভিযোগ, নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের জন্য তাকে দিনরাত কাজ করতে বাধ্য করা হতো এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ক্রমাগত হুমকির মুখে থাকতে হতো। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় রিঙ্কু তরফদার নামে এক শিক্ষিকা আত্মহত্যা করেছেন। তিনিও তার চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের এই অসহনীয় চাপের কথা সরাসরি উল্লেখ করে গেছেন। রাজস্থানেও অনুরূপভাবে এক ভোটকর্মী ল্যাপটপে কাজ করার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঘুম আর পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে সুস্থ মানুষগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।
নির্বাচন কমিশন এই বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রমকে স্বাভাবিক দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোটকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কোনো যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি এবং পুরনো আমলের গ্রাম্য নথিপত্র ডিজিটাল করার কাজে সার্ভারের সমস্যা ও ইন্টারনেটের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিরোধী দলগুলো এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্র’ এবং ‘ভোট চুরির পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, তাড়াহুড়ো করে তালিকা সংশোধন করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি কর্মীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে একটি নাচের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হলে সেটিকে ‘অমানবিক ও সংবেদনহীনতা’র চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। নিহতদের পরিবার এখন সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ও কর্মসংস্থানের দাবি জানাচ্ছে। বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক দল এই বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের বিশাল নির্বাচনী যজ্ঞের নেপথ্যে থাকা সাধারণ কর্মীদের এই মৃত্যুমিছিল এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল