ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক আকাশ যুদ্ধের রেশ ধরে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের সমরাস্ত্রের চাহিদা বেড়েছে। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কূটনীতিতেও ব্যাপক জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে সংযোজিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে চার দিনের তীব্র আকাশ সংঘর্ষে এই বিমানের কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর থেকেই মূলত এর বাজার সম্প্রসারণের পালে হাওয়া লেগেছে।
ইসলামাবাদ এখন এই মাল্টি-রোল ফাইটারকে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিমানের তুলনায় সাশ্রয়ী ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত বিকল্প হিসেবে বিশ্ববাজারে তুলে ধরছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই বাজারের মূল লক্ষ্য হলো এমন সব দেশ যারা বাজেটের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে অথবা পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর শর্তযুক্ত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ক্লান্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের এই অস্ত্র ব্যবসার মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানটির বাস্তব পারফরম্যান্স। পাকিস্তান দাবি করেছে যে তাদের এই বিমানটি ভারতের অত্যন্ত উন্নত ও ফরাসি প্রযুক্তির রাফাল যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। অন্তত একটি রাফাল ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
যদিও নয়াদিল্লি এই দাবি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পাকিস্তানের জন্য এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেতারা এখন কেবল জেএফ-১৭-এর কম দাম দেখে আকৃষ্ট হচ্ছে না বরং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর আধুনিক যুদ্ধ কৌশল এবং এই বিমানের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। একইসাথে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো এখানে কোনো রাজনৈতিক ভেটো বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ না থাকায় অনেক দেশই এখন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে।
প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে আফ্রিকায়। সুদানের সাথে পাকিস্তানের প্রায় ১৫ কোটি ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। যার মধ্যে অত্যাধুনিক জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি ফাইটার এবং দুই শতাধিক ড্রোন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে লিবিয়ার খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সাথেও পাকিস্তানের প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের একটি বিশাল প্রতিরক্ষা সমঝোতা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করছে। এটি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা রপ্তানির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরাক ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও এখন পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান এবং প্রশিক্ষণ বিমানের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যেও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা দিচ্ছে সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের পরিবর্তিত প্রতিরক্ষা সমীকরণ। রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যেখানে কোনো এক দেশের ওপর হামলাকে উভয়ের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের ২০০ কোটি ডলারের ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের অর্ডারে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। যদিও সৌদি আরবের বিমানবাহিনীতে ইতোমধ্যেই পশ্চিমা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবিমানগুলো মজুদ রয়েছে। তবুও পাকিস্তানের সাথে এই চুক্তিকে তারা একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির অংশ হিসেবে দেখছে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সফলভাবে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক লাভে রূপান্তর করে পাকিস্তান এখন বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল