তেহরান এখন যুদ্ধকে আর কেবল অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে না বরং একে টিকে থাকার পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে ওমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্য অবস্থান করলেও তেহরানের নীতিনির্ধারকদের কাছে কূটনীতির টেবিল এখন এক ক্ষয়িষ্ণু ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ধারণা, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে যে সমাধান আসবে, তা ইরানকে কেবল ক্রমান্বয়ে দুর্বল করবে। এর বিপরীতে একটি নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ বা সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া হলে তা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ করে দিতে পারে।
দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে চললেও বর্তমানে ইরানের শীর্ষ মহলে এই বিশ্বাস জন্মেছে, যে সমস্যার সমাধান কূটনীতি দিয়ে সম্ভব নয়, তা হয়তো নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।
এই কৌশলগত পরিবর্তনের মূলে রয়েছে ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া আলোচনার কাঠামো। ইরান মনে করে, পরমাণু কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে একই সূত্রে গেঁথে যে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, তা আদতে কোনো সমাধান নয় বরং একটি কৌশলগত আত্মসমর্পণ। তেহরানের দৃষ্টিতে এই ধরনের কূটনীতি এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ দেয় না বরং রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাই আলোচনার টেবিলে পরাজিত হওয়ার চেয়ে সংঘাতের পথ বেছে নেওয়াকে তারা এখন কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই যুদ্ধের দামামা তেহরানের জন্য একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ইরান বর্তমানে কয়েক দশকের মধ্যে সবথেকে ভয়াবহ বৈধতার সংকটে ভুগছে। নজিরবিহীন দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের মুখে শাসকগোষ্ঠী যখন কোণঠাসা, তখন যুদ্ধ পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের নতুন পথ খুলে দেয়।
যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থায় যেকোনো প্রতিবাদকে শত্রুরাষ্ট্রের সাথে আঁতাত বা জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে প্রচার করা সহজ হয়। এর ফলে সাধারণ সময়ে যে দমন-পীড়ন জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে, যুদ্ধের আবহে তা বৈধতা পায়। মূলত অবাধ্য সমাজকে ভয় ও শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতেই যুদ্ধের এই বয়ানকে তারা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে।
বৈদেশিক ফ্রন্টেও ইরানের হিসাব-নিকাশ পাল্টেছে। তেহরান বিশ্বাস করে, আফগানিস্তান ও ইরাকের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সীমাবদ্ধতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। ইরানি নীতিনির্ধারকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়ও, তবে তা হবে সীমিত আকাশপথের হামলা বা সাইবার আক্রমণ। তারা মনে করে, যতক্ষণ পর্যন্ত বিদেশী স্থলবাহিনী ইরানে প্রবেশ না করছে, ততক্ষণ এই শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। বরং সীমিত এই সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং মানবাধিকারের মতো আন্তর্জাতিক চাপগুলোকে আড়ালে পাঠিয়ে দিতে পারে।
তবে এই বিপজ্জনক কৌশলে একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। যুদ্ধের গতি প্রকৃতি সবসময় নিয়ন্ত্রিত থাকে না এবং তেহরানের এই নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের' ধারণা যেকোনো সময় মধ্যপ্রাচ্যে এক অনিয়ন্ত্রিত মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশল
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল