মাত্র ২৮০ বর্গমাইলের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র হয়েও সামরিক শক্তিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তাদের বিমান বাহিনীতে যুক্ত করতে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধবিমান এফ-৩৫বি। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সিঙ্গাপুরই হবে বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা কোনো বিমানবাহী রণতরী ছাড়াই সরাসরি স্থলভাগ থেকে এই বিশেষ ‘শর্ট টেক-অফ ও ভার্টিক্যাল ল্যান্ডিং’ সক্ষমতার স্টিলথ জেট পরিচালনা করবে।
সিঙ্গাপুরের মতো আয়তনে ছোট দেশের জন্য প্রথাগত রানওয়ে বা বিশাল বিমানঘাঁটি তৈরি করা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এফ-৩৫বি যুদ্ধবিমানের বিশেষত্ব হলো এটি খুব অল্প জায়গা থেকে উড্ডয়ন করতে পারে এবং হেলিকপ্টারের মতো খাড়াভাবে অবতরণ করতে সক্ষম। এর ফলে যুদ্ধের সময় প্রধান বিমানঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সিঙ্গাপুর তাদের মহাসড়ক বা ছোট কংক্রিট প্যাড থেকে এই যুদ্ধবিমানগুলো পরিচালনা করতে পারবে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড. এনজি ইং হেন এই সক্ষমতাকে সিঙ্গাপুরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশের আকাশপথ সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হবে।
যদিও সিঙ্গাপুরের সাথে সরাসরি কোনো দেশের বড় ধরনের বিরোধ নেই। তবে দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা দেশটিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং সম্ভাব্য চীনা হুমকি মোকাবিলা করতেই সিঙ্গাপুর এই পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টিলথ জেট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে তারা ১২টি এফ-৩৫বি এবং পরবর্তী সময়ে আরও ৮টি এফ-৩৫এ ভ্যারিয়েন্টের অর্ডার দেয়। সব মিলিয়ে সিঙ্গাপুরের বহরে ২০টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সিঙ্গাপুর বিমান বাহিনীর বর্তমান শক্তি মূলত মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে তাদের বহরে প্রায় ৬০টি এফ-১৬ এবং ৪০টি এফ-১৫এসজি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী এয়ার ফ্লিট হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ বাহিনী এ অঞ্চল থেকে চলে যাওয়ার পর মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সিঙ্গাপুর শূন্য থেকে এক বিশ্বমানের বিমান বাহিনী গড়ে তুলেছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় তারা এখন তাদের পুরনো এফ-১৬ বিমানগুলোকে সরিয়ে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী এফ-৩৫ দিয়ে প্রতিস্থাপন করছে।
কেবল যুদ্ধবিমানই নয় সিঙ্গাপুরের সামরিক প্রস্তুতি অত্যন্ত বহুমুখী ও সুসংগঠিত। তাদের কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, চিনুক ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টার এবং সমুদ্রসীমায় নজরদারির জন্য শক্তিশালী পি-৮ পসাইডন বিমান। এছাড়া দেশটির গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে গালফস্ট্রিম জি-৫৫০ এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়, এটি ৩৬০ ডিগ্রি কোণে কয়েকশ কিলোমিটার পর্যন্ত শত্রু নজরদারি করতে সক্ষম।
সিঙ্গাপুরের এই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাদের প্রতিরক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় উন্নয়নেরই একটি প্রতিফলন। ক্ষুদ্র এই দেশটিতে কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকলেও তারা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম বন্দর এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় সিঙ্গাপুর বিশ্ব বাণিজ্যের এক অপরিহার্য গেটওয়ে হয়ে উঠেছে। স্থিতিশীল সরকার, আধুনিক অবকাঠামো এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশের কারণে দেশটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের বৈশ্বিক প্রভাব ফুটে ওঠে তাদের পাসপোর্টের শক্তিতেও। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালেও সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এই পাসপোর্টের ধারকরা বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। এছাড়া চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরের স্বীকৃতি পেয়ে সিঙ্গাপুরের আতিথেয়তা ও উন্নত প্রযুক্তির জয়গান গেয়ে চলেছে।
সূত্র: ইউরোএশিয়ান টাইমস
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল