ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চালানো অপারেশন এপিক ফিউরি'র প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন হলেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীকে। যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টায় প্রায় ৪০০ টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল নিক্ষেপ করার ফলে পেন্টাগন এখন এক ভয়াবহ কৌশলগত সংকটের মুখে পড়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা এই অবস্থাকে এম্প্টি র্যাক (রিক্ত ভাণ্ডার) সংকট হিসেবে অভিহিত করছেন। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতের সময় এই মিসাইল ঘাটতি ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক হ্যারিসন কাস এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, মাত্র তিন দিনে যে পরিমাণ টমাহক মিসাইল খরচ হয়েছে, বর্তমান উৎপাদন গতি অনুযায়ী তা পুনরায় পূরণ করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে। ১৩টি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার এবং সাবমেরিন থেকে পরিচালিত এই অবিরাম আক্রমণ মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর মজুদ করা আধুনিক অস্ত্রের প্রায় ১০ শতাংশ নিঃশেষ করে দিয়েছে। এই উচ্চ হারের ব্যয় বজায় থাকলে অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোনো বড় ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পাল্টা আঘাত হানার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম থাকবে না।
টমাহক মিসাইল মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এবং নিখুঁতভাবে শত্রুর রাডার বা কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করতে পারে। তবে সমস্যা হলো, এই মিসাইলগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। পেন্টাগন চাইলেই রাতারাতি এর উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারছে না কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ এবং সলিড রকেট মোটরের সরবরাহ চেইন বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
বর্তমানে বছরে মাত্র ৭২ থেকে ৯০টি টমাহক মিসাইল তৈরির সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। অথচ অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ১২ ঘণ্টাতেই প্রায় ৯০০টি স্ট্রাইক পরিচালনা করা হয়েছে। একটি একক মিসাইল তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে এবং এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ মাত্র একটি বা দুটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে আসে। ফলে ইরান যুদ্ধে এই বিপুল পরিমাণ অপচয় মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। চীন যদি এই সুযোগে তাইওয়ান আক্রমণ করে বসে, তবে মার্কিন নৌবাহিনী সম্ভবত কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের হাতে থাকা অবশিষ্ট টমাহক মিসাইলের মজুদ হারিয়ে ফেলবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা ওয়াশিংটনের জন্য এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয় এই মিসাইল সংকটের প্রভাব পড়ছে তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপরও। জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো যারা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে টমাহক মিসাইল কেনার চুক্তি করেছে, তারা এখন দীর্ঘ বিলম্বের শিকার হতে পারে। মিত্ররা যখন দেখছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজ দেশের জরুরি মজুদই ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শত্রুপক্ষও যুক্তরাষ্ট্রের এই উৎপাদন সীমাবদ্ধতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যা তাদের সাহস বাড়িয়ে দিতে পারে।
অপারেশন ইরাকি ফ্রিডমের সময় প্রায় ৮০০টি টমাহক ব্যবহার করা হয়েছিল কিন্তু তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি এবং বর্তমান সরবরাহ চেইনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানের অত্যাধুনিক আইএডিএস বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি মিসাইল প্রয়োজন হয়। ফলে ইরানকে চাপে রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের অজান্তেই এশীয় অঞ্চলে নিজের অবস্থান নড়বড়ে করে তুলছে। এটি এমন এক ফাঁদ যেখানে সামরিক জয় এলেও কৌশলগত পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে।
সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল