মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের কুয়াশা এখন মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অপারেশন এপিক ফিউরির তৃতীয় দিনে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পেন্টাগন। গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশসীমায় কুয়েতি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফ্রেন্ডলি ফায়ারে (ভুলবশত চালানো গোলার আঘাতে) মার্কিন বিমানবাহিনীর তিনটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন মার্কিন প্রশাসন দাবি করছিল যে তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। কিন্তু রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, যেখানে সমন্বয়হীনতা আর বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিধ্বস্ত হওয়ার মুহূর্তে বিমানগুলো ইরানের দিক থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টা জবাব দিতে কুয়েতের আকাশে অবস্থান করছিল। তীব্র উত্তেজনার মাঝে কুয়েতি রাডার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই আমেরিকান বিমানগুলোকে শত্রুপক্ষ হিসেবে শনাক্ত করে ভুলবশত আঘাত হানে। অত্যন্ত আধুনিক ই-পাউস ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট এবং এএন/এপিজি-৭০ রাডার থাকা সত্ত্বেও এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি। যদিও বিমানের ভেতরে থাকা তিন পাইলট এবং তিনজন ওয়েপন সিস্টেম অফিসার সফলভাবে প্যারাসুটের মাধ্যমে নিচে নামতে সক্ষম হয়েছেন এবং বর্তমানে তারা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন।
কুয়েত সরকার ইতিমধ্যে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের দায় স্বীকার করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে। তবে এই ঘটনাটি কেবল একটি কারিগরি ত্রুটি নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশগুলোর মধ্যে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক সমন্বয়ের গভীর সংকটকে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের ময়দানে যখন শত শত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র চারপাশ থেকে আসতে থাকে, তখন নিজের আর শত্রুর বিমানের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ‘ফগ অফ ওয়ার’ (যুদ্ধের অস্পষ্টতা) এখন মার্কিন কৌশলের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠছে।
বিমানের ধ্বংসস্তূপ এবং পাইলটরা যখন কুয়েতের লোকালয়ে এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্থানীয় কুয়েতি নাগরিকদের একটি বড় অংশ মার্কিন পাইলটদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর বদলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে। উত্তেজিত জনতার ভিড়ে অনেককে লাঠিসোঁটা হাতে দেখা যায়, যারা এই যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে সরাসরি দায়ী করছেন। সাধারণ মানুষের মতে, ওয়াশিংটন অযথা ‘ইরানি বাঘকে’ খোঁচানোর ফলে আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংসের মুখে পড়েছে এবং তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্যগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসার পর মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছিল, ইরানের আক্রমণাত্মক ক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান এখনো পুরো অঞ্চলে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই নিরবচ্ছিন্ন হামলার মুখে মার্কিন ও তাদের মিত্র দেশগুলো এতটাই দিশেহারা যে তারা এখন ভুলবশত নিজেদের ওপরই হামলা চালাচ্ছে। পেন্টাগনের গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে রণক্ষেত্রের এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য এখন ট্রাম্প প্রশাসনের আগের দাবিগুলোকে হাস্যকর করে তুলছে। ইরানের এই তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে এবং একতরফা জয়ের মার্কিন স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছে।
যে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগলগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে, সেগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট এই যুদ্ধবিমানগুলো শব্দের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম এবং এটি প্রায় ৬০ হাজার ফুট উচ্চতায় অভিযান পরিচালনা করতে পারে। বিমানগুলোতে পারমাণবিক বোমা বহন করার ক্ষমতা থাকলেও আধুনিক যুগের ড্রোন ও মিসাইল যুদ্ধের সামনে এগুলোর সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ছে। যদিও মার্কিন বিমানবাহিনী এখন এই পুরনো প্রযুক্তির বদলে আরও দামি এফ-১৫ইএক্স ইগল-২ নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে কিন্তু এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া যথেষ্ট ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্র্যান্ডন জে. উইকার্ট মনে করেন, এই ঘটনাটি মার্কিন সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের দাবির ওপর একটি বড় চপেটাঘাত। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ট্যাক্স ডলার খরচ করে এই বিমানগুলোর সেন্সর এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম উন্নত করা হলেও আসল যুদ্ধের ময়দানে সেগুলো কুয়েতি রাডারের ভুল শনাক্তকরণ থেকে রক্ষা পায়নি। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, প্রযুক্তির যতই উন্নতি হোক না কেন, বিশৃঙ্খল এবং দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধে কোনো পক্ষই নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যখন স্থানীয় জনগণের সমর্থন হারানো শুরু হয়, তখন সেই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত এই দুর্ঘটনাটি একটি বৃহত্তর সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অপারেশন এপিক ফিউরি যে একটি সংক্ষিপ্ত এবং সহজ যুদ্ধ হবে না, তার প্রমাণ মিলছে প্রতিটি ধাপে। বন্ধুপ্রতিম দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদের বিমান ধ্বংস হওয়া এবং জনরোষের মুখে পড়া পেন্টাগনের জন্য এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ইরান যুদ্ধের এই রক্তক্ষয়ী শুরু বুঝিয়ে দিচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে মার্কিন বিমানবাহিনীকে আরও কঠিন এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল