২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে অভাবনীয় ও বিধ্বংসী রণসজ্জার সমাহার ঘটিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী। দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বোমারু ত্রয়ী তথা বি-২ স্পিরিট, বি-১বি ল্যান্সার এবং বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেসকে ইরানের আকাশসীমায় একযোগে অভিযানে নামানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ডক্টর অ্যান্ড্রু ল্যাথাম এই সামরিক তৎপরতাকে মার্কিন বিমান শক্তির এক বিরল এবং প্রাণঘাতী সমন্বয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সম্মিলিত আক্রমণ পরিকল্পনাটি এখন প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করে বড় আকারের ধ্বংসযজ্ঞের ধাপে প্রবেশ করেছে।
অপারেশন এপিক ফিউরি নামের এই অভিযানে প্রতিটি বোমারু বিমানকে তাদের সুনির্দিষ্ট দক্ষতার ভিত্তিতে মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযানের সম্মুখভাগে রয়েছে বি-২ স্পিরিট যা মূলত এর রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা (স্টিলথ প্রযুক্তি) ব্যবহার করে ইরানের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এই বিমানগুলো অত্যন্ত নিখুঁত নিশানায় ইরানের কমান্ড সেন্টার এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানছে। এর ফলে দেশটির প্রতিরক্ষামূলক বর্মটি শিথিল হয়ে পড়েছে এবং পরবর্তী ধাপের ভারী বোমারু বিমানগুলোর জন্য পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ার পর রণক্ষেত্রে আবির্ভূত হয়েছে বি-১বি ল্যান্সার। এই বিমানটি মূলত বিপুল পরিমাণ প্রচলিত অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং এর গতিবেগ অত্যন্ত বেশি। বি-২ যেখানে পথ তৈরি করে দিচ্ছে, বি-১বি সেখানে ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ বোমাবর্ষণ করে ইরানের ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং নৌ-অবকাঠামোগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে। এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন বাহিনী একটি নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যেখানে ইরান কোনো বিরতি ছাড়াই একের পর এক শক্তিশালী হামলার সম্মুখীন হচ্ছে।
একই সাথে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ট্রাক হিসেবে পরিচিত বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস নিরাপদ দূরত্ব থেকে ইরানে ক্রুজ মিসাইলের বৃষ্টি বর্ষণ করছে। কয়েক দশক পুরনো হলেও এই বিমানটির বহুমুখী সক্ষমতা একে বর্তমান যুদ্ধেও অপরিহার্য করে তুলেছে। এটি সরাসরি ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ না করেই শত শত মাইল দূর থেকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারছে। এই ত্রিমুখী আক্রমণে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা, মজুদাগার এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।
পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের নৌ-অবকাঠামো এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন এই বিমান হামলার সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ইরানের লজিস্টিক ভেসেল এবং ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফটগুলোর মূল ঘাঁটিগুলো এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে। একের পর এক হামলার মাধ্যমে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ল্যাথাম সতর্ক করে বলেছেন, কেবল অবকাঠামো ধ্বংস করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না।
ইরান গত কয়েক দশক ধরে এই ধরনের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে যা এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। দেশটির অনেক সংবেদনশীল স্থাপনা মাটির গভীরে কয়েক স্তর বিশিষ্ট শক্তিশালী কংক্রিট এবং পাথরের নিচে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী মূলত মোবাইল লঞ্চারের ওপর নির্ভরশীল যা খুব দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। ফলে বিমান থেকে বড় বড় দালানকোঠা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা সক্ষমতা এবং ভ্রাম্যমাণ ইউনিটগুলো মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান শক্তি দিয়ে কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতা সাময়িকভাবে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও রাজনৈতিক ফলাফল সবসময় কাঙ্ক্ষিত হয় না। ইরান সরকার এই হামলাকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারে যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হলেও যদি প্রযুক্তির জ্ঞান এবং মোবাইল লঞ্চারগুলো টিকে থাকে তবে ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি দূর হবে না। কৌশলগতভাবে মার্কিন বাহিনী ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ক্ষমতা রাখলেও যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
তাই বি-২, বি-১বি এবং বি-৫২ বোমারু বিমানের এই যৌথ অভিযান বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো কোনো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করার সামর্থ্য রাখলেও রাজনৈতিক বিজয় বা দীর্ঘমেয়াদী শান্তি স্থাপনের বিষয়টি কেবল বিমান শক্তির নাগালের বাইরে থাকে। ইরানের মতো একটি দেশের ক্ষেত্রে এই কৌশলগত বোমাবর্ষণ কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দেশটির নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল