ইরানে হামলা শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং যুদ্ধ আরও বিস্তৃত আকার নিচ্ছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের সূত্রের মতে হামলার পরিকল্পনা করার সময় ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সম্ভাবনা বা এর প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে এখন জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত শুধু ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উপসাগরীয় যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সেসব এলাকাতেও হামলা শুরু হয়। পরে বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব একটি তেল শোধনাগার বন্ধ করে দেয়। কাতার গ্যাস উৎপাদন স্থগিত করে। ইরাক, ওমান, বাহরাইনেও তেল স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া যায়। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে গিয়ে এসব দেশের আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতাও দ্রুত কমে আসতে শুরু করে।
ফলে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ওই অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা শুরু করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে টার্মিনাল হাই অল্টিচিউড এরিয়া ডিফেন্স থাড সিস্টেমের অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন।
সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য পরিণতি পুরোপুরি বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ আগের প্রশাসনগুলো হরমুজ প্রণালী নিয়ে যে বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দিয়েছিল তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক প্রশাসনে কাজ করা একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বহু বছর ধরে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে কবে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন শুরু হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিএনএনের আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার পর ট্রাম্প এখন এমন এক যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন যার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সামরিকভাবে ইরান তুলনামূলক দুর্বল হলেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান সিএনএনকে বলেন, যদি হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করা না যায় তাহলে কোনো পক্ষই প্রকৃত বিজয় দাবি করতে পারবে না। তাঁর মতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য প্রণালীটি আবার চালু করা জরুরি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সহজ নয়।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চলমান যুদ্ধের দীর্ঘায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য দ্রুত বাড়ছে।
গত কয়েক দিনে বিভিন্ন হামলা ও পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিরশেবায় একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সিএনএন জানায়, ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছে।
এদিকে বিবিসি জানিয়েছে, ওমানে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে দুইজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দুবাইয়ের আল কুজ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৫ হাজার হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছেন।
সোর্স: সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান
বিডি প্রতিদিন/আশিক