ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম প্রাক-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়াশিংটন-তেল আবিব হামলার জবাবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার প্রধান গন্তব্য এশিয়া ও ইউরোপ। ইরান শুধু জাহাজ চলাচল বন্ধ করেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে। এর ফলে জ্বালানির পাশাপাশি হিলিয়ামের মতো উপজাত পণ্যের দামও আকাশচুম্বী হয়েছে, যা সেমিকন্ডাক্টর এবং গৃহনির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনে অপরিহার্য। এমনকি সারের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা সরাসরি কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
টাফটস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুলের মেরিটাইম স্টাডিজের অধ্যাপক রকফোর্ড ওয়েইটজ আল জাজিরাকে জানান, বাজার কবে স্বাভাবিক হবে তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ-সাতটিতে।
ওয়েইটজ মনে করেন, তেলের বাজার স্থিতিশীল হতে হলে হরমুজ প্রণালিতে কার্গো চলাচল পুনরায় নিরাপদ ও নিয়মিত হওয়া জরুরি। তবে এই প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তি ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সমন্বয় প্রয়োজন।
জ্বালানি তেলের দাম চড়া থাকার পেছনে বিমা খরচ বৃদ্ধি এবং ইরানের পক্ষ থেকে জাহাজের ওপর বিশেষ টোল আদায়ের খবরকেও একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের এই টোল আদায়ের প্রচেষ্টার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি জাহাজে ২০ লাখ ডলারের তথাকথিত এই ফি তেলের মূল দাম পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়, বরং মূল সমস্যা হলো জাহাজ চলাচলের পথে অনিশ্চয়তা।
উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ঊষা হ্যালি মনে করেন, যুদ্ধবিরতি হলেও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজির বাজার স্বাভাবিক হতে অন্তত তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগবে। বিশেষ করে ইরাকের মতো দেশগুলো স্টোরেজ সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩ শতাংশের পূর্বাভাস থেকে কমিয়ে আনা হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, শান্তি বজায় থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতি হবে ধীর।
অধ্যাপক হ্যালি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন—এই যুদ্ধে রাশিয়ার মতো দেশগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে অনেক দেশ চড়া দামে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে।
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে এক ধরনের ঝুঁকি ও আতঙ্ক কাজ করছে, যা তেলের দামকে দীর্ঘ সময় চড়া রাখবে। শেষ পর্যন্ত ইরাক যদি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন শুরু করতে পারে, তবেই বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে এই অস্থিতিশীল পরিবেশে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখনো সন্দিহান।
সূত্র: আল জাজিরা
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি