চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে যে শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছেন, তার স্পষ্ট চিত্র দেখা গেল সাম্প্রতিক এক আইনসভা বৈঠকে। এক বছর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ফুটেজে সেখানে প্রায় ৪০ জন জেনারেলকে দেখা গিয়েছিল। এবার ছিল হাতেগোনা কয়েকজন।
তবুও শি ইঙ্গিত দিলেন, মাও যুগের রাজনৈতিক ঝড়ের সঙ্গে তুলনীয় এই অস্থিরতা এখনো শেষ হয়নি। কঠোর সুরে তিনি অবশিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করলেন- অবিশ্বস্ততার বিরুদ্ধে সাবধান থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীতে এমন কাউকে কখনো থাকতে দেয়া যাবে না, যার হৃদয় পার্টির প্রতি বিভক্ত।
এটি ছিল শি জিনপিংয়ের ক্ষমতায় থাকার ১৩ বছরে সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটির বিরল প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। তিনি সেই সামরিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছেন, যাদের তিনি এক দশক ধরে নিজ হাতে পুনর্গঠন করেছেন।
তাইওয়ানের ন্যাশনাল চেংচি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চিয়েন-ওয়েন কৌ বলেন, শি যখন ‘বিভক্ত হৃদয়’ কথাটি ব্যবহার করেন, তখন এর গভীর অর্থ থাকে।
তিনি বলেন, এই শব্দগুচ্ছ প্রাচীন চীনা রাজনৈতিক গ্রন্থে পাওয়া যায়। সেখানে শাসকদের বিশ্বাসঘাতক জেনারেলদের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। এমন একটি বই শি জিনপিং নিজের বুকশেলফে রেখেছেন।
অধ্যাপক কৌ বলেন, এমনকি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীরাও পতনের শিকার হয়েছেন। তাহলে এখন আর কার ওপর তিনি বিশ্বাস রাখবেন? এই সংকট শি জিনপিংয়ের অন্যতম বড় অর্জনকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। সেই অর্জন হলো চীনা সামরিক বাহিনীকে একটি শক্তিশালী বাহিনীতে রূপান্তর করা, যেখানে রয়েছে নতুন বিমানবাহী রণতরী, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সম্প্রসারিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। এই সংকট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। আর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলা ও ইরানে আমেরিকার সামরিক শক্তি এবং তার সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করেছে।
শি যে ‘শুদ্ধি অভিযান’কে বাহিনীকে শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ করার জন্য জরুরি বলেছেন, সেই অভিযানই বহু বছর ধরে চীনের যুদ্ধ প্রস্তুতিকে ব্যাহত করতে পারে। যা শুরুতে সীমিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান মনে হয়েছিল, তা পরে ডজন ডজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে অপসারণের ব্যাপক অভিযানে পরিণত হয়। এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে চলতি বছরের শুরুতে, যখন পতন ঘটে ঝাং ইউশিয়ার। তিনি চীনের সর্বোচ্চ ইউনিফর্ম পরিহিত কমান্ডার। তিনি শি’র ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হতেন।
কিছু সূত্রের মতে, তাদের মধ্যে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটে তখন, যখন শি সামরিক শুদ্ধি অভিযানের নেতৃত্ব দানকারী জেনারেলকে এমন এক পদে উন্নীত করতে চান, যা ঝাং ইউশিয়ার ক্ষমতার সমকক্ষ হয়ে উঠত। জেনারেল ঝাং এতে আপত্তি জানান। কয়েক মাস পর তিনিই অপসারিত হন। এই অভিযানের গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট হয় গত সপ্তাহে, যখন একটি সামরিক আদালত ঘুষ নেয়ার দায়ে চীনের দুই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, যদিও দুই বছরের জন্য তা স্থগিত রাখা হয়। সম্ভবত তারা জীবনের বাকি সময় কারাগারেই কাটাবেন। ইয়েল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিয়েল ম্যাটিংলি চীনের রাজনীতি ও সামরিক বাহিনী নিয়ে গবেষণা করেন।
তিনি বলেন, এটি শি জিনপিংয়েরই সামরিক বাহিনী। তাহলে তিনি কেন নিজের তৈরি জিনিসটিকেই ভেঙে দিচ্ছেন? তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগেও মানুষ শি সম্পর্কে এমনটা কল্পনা করতো না। গভীর কিছু বদলে গেছে বলে। শি যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছেন, তা বাস্তব। কিন্তু তার আগের অভ্যন্তরীণ ভাষণগুলো- যেগুলোর বিস্তারিত আগে প্রকাশিত হয়নি, তা আরেকটি বিষয়ও প্রকাশ করে। তাহলো তিনি এমন এক নেতা, যিনি যেকোনো অবাধ্যতার ইঙ্গিতের মধ্যেই নিজের শাসনের জন্য রাজনৈতিক হুমকি দেখতে শুরু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, শি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে সামরিক আধুনিকায়নের জন্য যেসব কমান্ডারকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তারা আর বিশ্বাসযোগ্য নন। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি তাদের আনুগত্য ও দক্ষতাকে ক্ষয় করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতা শি জিনপিংয়ের দুই অগ্রাধিকারের মধ্যকার দ্বন্দ্বও প্রকাশ করেছে- যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং আনুগত্য নিশ্চিত করা।
শেষ পর্যন্ত শি যুদ্ধে অভিজ্ঞ এমন এক জেনারেলকে সরিয়ে দেন, যিনি তার সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার জায়গায় বসান একজন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। বর্তমানে শি ছাড়া চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কাউন্সিলে বাকি রয়েছেন শুধু সেই তদন্তকারী। অধ্যাপক কৌ বলেন, শি জিনপিংয়ের শাসন ধীরে ধীরে তার শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এই পর্যায়ে তার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে যায় এবং তার উদ্বেগ ক্রমশ নিজের অভ্যন্তরীণ বলয়ের সদস্যদের ঘিরে বাড়তে থাকে।
ক্ষমতায় আসার পরপরই শি জিনপিং সম্ভবত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, যাতে তার পূর্বসূরি হু জিনতাওয়ের পরিণতি তার না হয়। হু’কে ব্যাপকভাবে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখা হতো, যিনি সামরিক কমান্ডারদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। ২০১১ সালে এই দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসে, যখন তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বেইজিং সফর করেন। সেদিন সকালে চীনা ওয়েবসাইটগুলোতে চীনের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের খবর প্রকাশিত হয়। গেটস এ বিষয়ে হু জিনতাওকে প্রশ্ন করলে, হু এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে মনে হয়।
পরে সাংবাদিকদের গেটস বলেন, বেসামরিক নেতৃত্বকে দেখে মনে হচ্ছিল তারা পরীক্ষাটি সম্পর্কে বিস্মিত। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক জন কালভার বলেন, হু জিনতাওয়ের নির্দেশনাগুলো ছিল অনেকটা এমন, যেন সেনা কমান্ডাররা চাইলে তা বিবেচনা করতে পারে। মূলত এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যা আর পার্টির প্রতি সাড়া দিচ্ছিল না।
২০১২ সালে ক্ষমতায় এসে শি জিনপিং সেইসব কমান্ডারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন, যারা হু জিনতাওয়ের আমলে বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক হয়ে উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন, যাদের অবস্থানের কারণে একসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করা হতো। ২০১৪ সালে শি শত শত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পূর্ব চীনের গুটিয়ান শহরে ডেকে পাঠান। পার্টির ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯২৯ সালে মাও সেতুং সেখানেই সেই মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা আজও চীনা রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করে: পার্টিই বন্দুক নিয়ন্ত্রণ করবে।
শি সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে সতর্ক করেন যে কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক মাত্রায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। গুটিয়ানে শি তার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যাগুলোর বর্ণনা দেন।
পার্টির আদর্শে বিশ্বাস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অবাধ্যতা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। তিনি এমন সামরিক মহড়ার উদাহরণ দেন, যেখানে অস্ত্রের বদলে সৈন্যরা কোদাল ও লাঠি ব্যবহার করেছে।
শির কাছে পচনের প্রতীক ছিলেন জেনারেল সু চাইহৌ। তিনি ছিলেন সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, অর্থাৎ পিপল্স লিবারেশন আর্মির শীর্ষ পর্যায়ের অন্যতম ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বিপুল ঘুষ নিয়েছেন, এমনকি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতেও ঘুষ নিয়েছেন। গুটিয়ানে দেওয়া এক অভ্যন্তরীণ ভাষণের আগে প্রকাশ না পাওয়া সংস্করণে শি বলেন, সু চাইহৌ সবসময় পার্টির প্রতি অটল আনুগত্য ও ভালোবাসার কথা জোর দিয়ে বলতেন। কিন্তু বাস্তবে, তার আত্মার গভীরে তিনি অনেক আগেই পার্টি থেকে বিচ্যুত হয়ে দুর্নীতি ও অধঃপতনে নিমজ্জিত হয়েছিলেন।
বিদেশের ঘটনাবলিও শি’কে উদ্বিগ্ন করে। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন নেতাদের উদাহরণ দেন, যাদের সরকার পতন হয়েছিল, কারণ বিদ্রোহের মুখে তাদের সামরিক বাহিনী তাদের ত্যাগ করেছিল।
শি জিন পিং পিপল্স লিবারেশন আর্মির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে বড় হন। তার পিতা ছিলেন মাওয়ের অধীনে যুদ্ধ করা এক বিপ্লবী নেতা। কর্মজীবনের শুরুতে শি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সচিব হিসেবেও কাজ করেন। শি বিশ্বাস করতেন, কমিউনিস্ট পার্টি ও নিজের প্রতি সামরিক বাহিনীর আনুগত্য নিশ্চিত করতে হলে তাকে রাজনৈতিক কাজ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। অর্থাৎ মতাদর্শগত শিক্ষা, যাচাই-বাছাই ও নজরদারি, যা কর্মকর্তাদের বিশ্বস্ত করে তোলে।
গুটিয়ানে নতুন শৃঙ্খলার বার্তা জোরালো করতে শি’কে দেখা যায় মোটা চালের ভাত ও কুমড়ার স্যুপ খেতে- প্রাথমিক রেড আর্মির সেই ঐতিহাসিক ও সাধারণ খাবার। শি বলেন, পার্টির প্রতি পরম আনুগত্যে ‘পরম’ শব্দটাই মূল বিষয়। এটি এমন এক আনুগত্য, যা একক, পূর্ণ, নিঃশর্ত এবং যেকোনো ভেজাল বা ভণ্ডামিমুক্ত।
ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরগুলো থেকেই শি ‘চেয়ারম্যান দায়িত্ব ব্যবস্থা’ শক্তিশালী করতে শুরু করেন। এটা এমন এক পুনর্গঠন, যা তাকে সামরিক বাহিনীর গভীর স্তর পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়। তিনি নিজের লোক বাছাইয়ের ক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেন। ২০১৬ সালের এক অভ্যন্তরীণ ভাষণে তিনি বলেন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ার চাবিকাঠি হলো সঠিক মানুষ নির্বাচন করা। জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারাই বাহিনী পরিচালনার মেরুদণ্ড, আর সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে এটি আমার ব্যক্তিগতভাবে দেখভাল করা উচিত।
তিনি বহু দশক পুরনো সামরিক অঞ্চলগুলো ভেঙে নতুন থিয়েটার কমান্ড গঠন করেন এবং পিপল্স লিবারেশন আর্মির কেন্দ্রীয় বিভাগগুলো বিলুপ্ত করেন, যেগুলোকে তিনি কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাধা মনে করতেন। তার লক্ষ্য ছিল স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীকে সমন্বিত করে চীনকে বৈশ্বিক শক্তি প্রক্ষেপণের সক্ষমতা দেয়া, একই সঙ্গে নিশ্চিত করা যে এই আধুনিক বাহিনী পার্টির প্রতি অবিচলভাবে অনুগত থাকবে।
জেনারেল ঝাং ইউশিয়া ছিলেন সেই কমান্ডারদের একজন, যাদের ওপর শি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রুক্ষ কিন্তু ক্যারিশম্যাটিক এই কর্মকর্তা ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে চীনের সীমান্তযুদ্ধে সামনের সারিতে লড়ে পরিচিতি পান। তার বাবাও ছিলেন এমন এক বিপ্লবী জেনারেল, যিনি শির বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।
শি তাকে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে উন্নীত করেন এবং সামরিক বাহিনীর জেনারেল আর্মামেন্টস ডিপার্টমেন্টের প্রধান বানান। এই বিভাগ নতুন অস্ত্র কেনার দায়িত্বে ছিল- যা শি’র আধুনিকায়ন পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিপুল অর্থ ও চুক্তির নিয়ন্ত্রণের কারণে এটি দুর্নীতির আখড়ায়ও পরিণত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ড্রু থম্পসন বলেন, তিনি সুবিধাভোগী কমিউনিস্ট পার্টি পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং সেটি তার মধ্যে স্পষ্ট ছিল। তার পারিবারিক পটভূমি, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস, অস্ত্রব্যবস্থার প্রতি স্বাচ্ছন্দ্য এবং পরিবর্তনের প্রতি উন্মুক্ততা- এই সমন্বয় তাকে শির কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
২০১৮ সালের মধ্যে শি মনে করতে শুরু করেন যে তার সংস্কার ফল দিচ্ছে। যদিও তিনি স্বীকার করেন সমস্যা এখনো আছে, তবু সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনকে তিনি বলেন, এই পরিবর্তন ঐতিহাসিক রূপান্তর এবং এটি সামরিক বাহিনীকে বাঁচিয়েছে।
২০২২ সালে শি তৃতীয় মেয়াদে নেতা নির্বাচিত হলে, তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে জেনারেল ঝাং ইউশিয়াকে বহাল রাখেন। ৭২ বছর বয়সে তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। তার পরিবর্তে শি তাকে চীনের শীর্ষ জেনারেল বানান এবং ২০২৭ সালের মধ্যে সামরিক সক্ষমতায় বড় অগ্রগতি আনার দায়িত্ব দেন। দুই সপ্তাহ পরে জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ড সেন্টার সফরে শি বলেন, সমস্ত শক্তি যুদ্ধ প্রস্তুতির দিকে কেন্দ্রীভূত করুন।
কিন্তু মাত্র ছয় মাস পর ২০২৩ সালে স্থিতিশীলতার মুখোশ ভেঙে পড়ে। শি হঠাৎ করেই রকেট ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডার ও তার ডেপুটিকে সরিয়ে দেন। যা ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক পদক্ষেপ, কারণ এই বাহিনী চীনের পারমাণবিক ও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে। এই শুদ্ধি অভিযানের কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। এরপর চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকেও কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়। হঠাৎ করেই মনে হতে থাকে, পিপলস লিবারেশন আর্মিকে রূপান্তর করার শির প্রকল্প একই দুর্নীতি ও অবাধ্যতায় আক্রান্ত, যা নির্মূল করার দাবি তিনি করেছিলেন।
এবার শি তার কমান্ডারদের নিয়ে যান ইয়ানআনে-মাও সেতুংয়ের বিপ্লবের ঐতিহাসিক ঘাঁটিতে। সেখানে তিনি রাজনৈতিক সংশোধন আরও গভীর করার আহ্বান জানান। পরবর্তী দুই বছরে ডজন ডজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অপসারিত হন বা জনসমক্ষে থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। অভিযান যত বিস্তৃত হতে থাকে, ততই ক্ষমতা বাড়তে থাকে জেনারেল ঝাং শেংমিনের। তিনি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন।
সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা কম থাকলেও তিনি রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার কাজে দক্ষ ছিলেন। রকেট ফোর্সে তিনি রাজনৈতিক কমিশনার ছিলেন। চীনা ব্রাশ ক্যালিগ্রাফির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। পরে তাকে এমন একটি নতুন সংস্থার নেতৃত্বে আনা হয়, যা সামরিক বাহিনীতে দুর্নীতি ও অবিশ্বস্ততা তদন্ত করে। তার উত্থান দেখায়, শি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতির পাশাপাশি আদর্শগত নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছিলেন।
ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক জোয়েল উথনাও বলেন, শির বিশ্লেষণে, দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত যুদ্ধ প্রস্তুতির ব্যর্থতা আসলে মতাদর্শগত অপবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সম্ভবত ২০২৩ সালে শি উপলব্ধি করেন যে পচন তার ধারণার চেয়েও গভীর, তাই তাকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক জন কালভার বলেন, জেনারেল ঝাং শেংমিনের ক্ষমতা সম্ভবত আরও বেড়েছিল সর্বব্যাপী নজরদারি প্রযুক্তির কারণে, যা তদন্তকারীদের কর্মকর্তাদের ও তাদের পরিবারের জীবন ও আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণের আরও বেশি সুযোগ দিয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই শুদ্ধি অভিযান শুধু সামরিক বাহিনীর কাঠামোই নয়, অবশিষ্ট কমান্ডারদের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে দিচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, তদন্ত যত গভীর হচ্ছিল, সামরিক অভিজাতদের মধ্যে তত বেশি অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। বিশেষ করে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে মনোযোগী কমান্ডার এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে। পরবর্তী কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেস আগামী বছরের শেষদিকে হওয়ার কথা। বিশ্লেষকদের মতে, সেই প্রেক্ষাপটে শি নিজের ক্ষমতার প্রতি সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছিলেন। তার শীর্ষ কমান্ডার জেনারেল ঝাং ইউশিয়াকে তখন অনেক বেশি প্রভাবশালী মনে হচ্ছিল, কারণ তার সম্ভাব্য বহু প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিমধ্যে অপসারিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও অক্ষত ছিলেন না। তদন্তে তার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কয়েকজন জেনারেলও ধরা পড়েন, যা পরোক্ষভাবে তাকেও জড়িয়ে ফেলতে পারতো।
অন্যদিকে তদন্তপ্রধান জেনারেল ঝাং শেংমিন ক্রমেই উত্থান ঘটাচ্ছিলেন। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে চায়না স্ট্র্যাটেজিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টোফার কে. জনসনের মতে, শেষ পর্যন্ত ভাঙন ঘটে তখন, যখন শি জেনারেল ঝাং শেংমিনকে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান করতে চান। জেনারেল ঝাং ইউশিয়া এবং তার ডেপুটি জেনারেল লিউ ঝেনলি এতে আপত্তি জানান।
জনসনের ভাষায়, তারা মনে করেছিলেন, একজন তদন্তকারীকে এত ক্ষমতাবান পদে বসানো হলে পিপল্স লিবারেশন আর্মিকে একটি অগুরুতর যুদ্ধবাহিনী হিসেবে দেখা হবে। আধুনিক চীনের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে সামরিক কমান্ডাররা ভেবেছিলেন তারা নেতাকে কতদূর পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। সম্ভবত জেনারেল ঝাংও একই ভুল করেছিলেন।
বিডি প্রতিদিন/নাজিম